আধুনিক বিশ্বে মানব পাচারের নতুন এবং ভয়াবহ এক রূপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সাইবার জালিয়াতি বা ‘স্ক্যাম সেন্টার’। সম্প্রতি প্রথম আলোর এক বিশেষ আয়োজনে এই অন্ধকার জগতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন ভুক্তভোগী মো. শফিকুল ইসলাম হৃদয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠা এসব স্ক্যাম সেন্টারের ফাঁদে পড়ে কীভাবে সাধারণ মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে এবং আধুনিক দাসত্বের শিকলে বন্দি হচ্ছে, তা এই আলোচনায় বিশদভাবে উঠে এসেছে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী এবং এতে বিশেষজ্ঞ মতামত প্রদান করেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের ম্যানেজার ও টিআইপি হিরো-২০২৫ খ্যাত আল আমিন নয়ন।

শফিকুল ইসলাম হৃদয়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে এবং সুশৃঙ্খল কর্মসংস্থানের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে শিক্ষিত ও দক্ষ যুবকদের বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। একবার সেসব দেশে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে জিম্মি করা হয় এবং সাইবার প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় যারা অস্বীকৃতি জানায়, তাদের ওপর নেমে আসে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের হাত ধরে চলা এই অপরাধচক্র এখন প্রযুক্তির অপব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে।

আল আমিন নয়ন তার পর্যবেক্ষণে জানান, বর্তমান বিশ্বে মানব পাচারের ধরন আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। আগে কেবল শ্রমিক হিসেবে পাচার করা হলেও, এখন তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতাকে পুঁজি করে তাদের সাইবার অপরাধে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, টিআইপি (ট্রাফিকিং ইন পারসন) প্রতিবেদনের আলোকে বাংলাদেশ সরকার ও বিভিন্ন এনজিও সমন্বিতভাবে কাজ করলেও, সচেতনতার অভাব এবং অবৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির দৌরাত্ম্য এই অপরাধ নির্মূলের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি অভিবাসীদের বিদেশে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা ও চাকরির সত্যতা যাচাই করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই বলে আলোচকরা অভিমত ব্যক্ত করেন। কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়, বরং প্রতিটি পরিবার ও তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাগুলোর সমন্বয় বাড়িয়ে এই ধরনের মানব পাচার রোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। আজকের এই সংকট কেবল বাংলাদেশের নয়, এটি একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ যা মোকাবিলায় প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা ও কঠোর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।