রাজধানীর লালমাটিয়ার খ্যাতনামা শিল্পকেন্দ্র ‘কলাকেন্দ্রে’ শুরু হয়েছে তরুণ প্রবাসী স্থপতি নূরী ভূঁইয়ার একক স্থাপত্য প্রদর্শনী। ‘ফর্ম থেকে ভাবনায়’ শিরোনামের এই আয়োজনে কেবল কাঠামোগত নকশা বা স্কেচ নয়, বরং স্থাপত্যের সঙ্গে চলচ্চিত্র ও দৃশ্যকলার মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে, যা শিল্পানুরাগী এবং সাধারণ দর্শকদের মাঝেও ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। গত বুধবার সন্ধ্যায় আয়োজিত এই প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিশিষ্ট স্থপতি সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা নুহাশ হুমায়ূন। অনুষ্ঠানটির সূচনা পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন কলাকেন্দ্রের পরিচালক ও বরেণ্য চিত্রশিল্পী ওয়াকিলুর রহমান, যিনি তরুণ এই স্থপতির শৈল্পিক যাত্রা ও মেধার পরিচয় তুলে ধরেন। প্রদর্শনীতে মার্কিন মুল্লুকের শিক্ষাজীবন এবং আন্তর্জাতিক ধারার স্থাপত্যচিন্তার অনন্য এক প্রতিফলন দেখা গেছে।

প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া কাজগুলোর পেছনের প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা তরুণ এই স্থপতির চিন্তাধারাকে সমৃদ্ধ করেছে। নূরী ভূঁইয়া যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় প্রজন্মের বাঙালি হিসেবে ২০২২ সালে বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি আমেরিকার মর্যাদাপূর্ণ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ায় স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত রয়েছেন। মূল একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি আর্ট, ফিল্ম অ্যান্ড ভিজ্যুয়াল স্টাডিজেও মাইনর সম্পন্ন করেছেন, যার স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায় তাঁর স্থাপত্য নকশা এবং ভিডিও চিত্রগুলোতে। বিশ্বখ্যাত স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুমের প্রতিষ্ঠান ‘মেরিনা তাবাশ্যুম আর্কিটেক্টস’ (এমটিএ)-তে ইন্টার্নশিপ করার সুবাদে তিনি বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং বাংলাদেশি স্থাপত্যশৈলীর শিকড় ও আধুনিকতার সেতুবন্ধন নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

‘ফর্ম থেকে ভাবনায়’ প্রদর্শনীতে নূরী ভূঁইয়ার দুটি ভিন্নধর্মী ও সুদূরপ্রসারী স্থাপত্য প্রকল্পের বিস্তারিত নকশা তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম নকশাটি ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার একটি ত্রিকোণাকার জায়গাকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক পাঠাগারের পরিকল্পনা, যেখানে জনপরিসর এবং স্থায়ী স্থাপনার মধ্যকার সুগভীর আন্তঃসম্পর্ককে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকল্পটি ফিলাডেলফিয়া ইনস্টিটিউট অব কনটেমপোরারি আর্টের (আইসিএ) একটি নতুন জাদুঘর সম্প্রসারণ সংক্রান্ত। এই স্থাপনাটি পশ্চিম ফিলাডেলফিয়া এলাকার পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনসাধারণের জন্য সমকালীন শিল্পচর্চার একটি উন্মুক্ত ও নিবেদিত কেন্দ্র হিসেবে নকশা করা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আন্তর্জাতিক মানের নকশায় তিনি স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুমের ২০১৬ সালে মর্যাদাপূর্ণ আগাখান পুরস্কার বিজয়ী উত্তরার দক্ষিণখানের বাইতুর রউফ মসজিদের কিছু শৈল্পিক ও টেকনিক্যাল আঙ্গিক সফলভাবে প্রয়োগ করেছেন।

স্থপতি ও কাঠামোগত নকশার পাশাপাশি এই প্রদর্শনীকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে বেশ কিছু ভিডিও চিত্র ও আলোকচিত্র। এর মধ্যে একটি ভিডিও চিত্রে উঠে এসেছে তাঁর নানির জীবনের সুক্ষ্ম অনুভূতি ও পারিবারিক আবেগের গল্প, অন্যটিতে রয়েছে বাইতুর রউফ মসজিদের স্থাপত্যশৈলী ও আধ্যাত্মিক আবহ নিয়ে নির্মিত একটি নান্দনিক ভিজ্যুয়াল প্রজেক্ট। আয়োজকদের মতে, এই ভিডিও চিত্রগুলো কাঠামোর ভেতরের প্রাণ ও মানবিক অনুভবের গল্প বলে, যা স্থাপত্যকে কেবল ইট-পাথরের খাঁচা থেকে মুক্ত করে একটি জীবন্ত সত্তায় রূপ দেয়। লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী প্রদর্শনীটি আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত যে কেউ এই প্রদর্শনী ঘুরে দেখতে পারবেন। চারুশিল্প ও স্থাপত্যের মেলবন্ধনে তৈরি এই আয়োজন ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।