রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ঢুকে তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় মারধরের ঘটনায় রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারসহ ছাত্রশিবিরের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ভিডিওচিত্র সামনে এসেছে। প্রক্টর, শিক্ষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে এমন হামলার ঘটনাকে নজিরবিহীন বলে অভিহিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সচেতন শিক্ষার্থীরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, লাইব্রেরির সামনে ও পাঠকক্ষের ভেতর শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সময় সালাউদ্দিন আম্মার ও তাঁর সহযোগীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। একটি সিসিটিভি ফুটেজ ও ধারণকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, আম্মার হাতে বেলচা নিয়ে গ্রন্থাগারের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন এবং এক শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ্য করে হুমকি দিচ্ছেন। অন্য একটি চিত্রে দেখা যায়, পাঠকক্ষের অভ্যন্তরে তিনি এক শিক্ষার্থীকে বড় লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাচ্ছেন। এ সময় একাধিক হল সংসদের প্রতিনিধি ও শিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে হামলায় অংশ নিতে দেখা যায়।
গ্রন্থাগারের ভেতরের বিশৃঙ্খলার পর আহত এক শিক্ষার্থীকে চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে সেখানেও বাধা দেওয়া হয়। মূল ফটকের সামনে রাখা অ্যাম্বুলেন্স থেকে আহত শিক্ষার্থীকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে এনে পুনরায় লাথি ও কিল-ঘুষি মারা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজে ছাত্রশিবিরের ক্যাম্পাস মনিটরিং কো-অর্ডিনেটর, সিনেট সদস্য ও বিভিন্ন হলের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিতদের সরাসরি এই হামলায় অংশ নিতে শনাক্ত করা গেছে। এমন তাণ্ডবকে ‘মব সন্ত্রাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ক্যাম্পাসের ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলো জড়িতদের দ্রুত বিচার দাবি করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে সংগঠনের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে বলা হয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার দাবি করেছেন, আগের বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং রাকসু প্রতিনিধিদের ওপর হামলার জের ধরে এই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুরো ঘটনা তদন্তে ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকেরা এই ঘটনাকে রাবির দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পরিমণ্ডলের জন্য চরম অবমাননাকর বলে মন্তব্য করেছেন। তারা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ২০১৪ সালে বর্ধিত ফি ও সান্ধ্য কোর্সবিরোধী আন্দোলনের সময়ও যখন পুলিশ ও ছাত্রলীগের তাড়া খেয়ে শিক্ষার্থীরা গ্রন্থাগারে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন শিক্ষকেরা মানবঢাল তৈরি করে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করেছিলেন। অথচ শিক্ষক ও প্রশাসনের সামনেই নির্বাচিত প্রতিনিধি ও ছাত্র নেতাদের হাতে শিক্ষার্থীদের এই ধরনের নির্যাতন বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির চরম বিপর্যয় নির্দেশ করে।