বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে খাদ্য এবং আবেগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই চিরন্তন সত্যকে ধারণ করে কল্লোল লাহিড়ী রচিত জনপ্রিয় উপন্যাস ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’ নিয়ে সম্প্রতি এক সাহিত্য আসর ও পাঠচক্রের আয়োজন করেছে সিলেট বন্ধুসভা। গত ২৪ জুলাই প্রথম আলো সিলেট অফিসের নিজস্ব কার্যালয়ে এই পঠন ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়, যেখানে সাহিত্যপ্রেমী তরুণ ও বন্ধুরা অংশ নেন।
উপন্যাসটির পটভূমি কলকাতার একটি সাধারণ পাইস হোটেল হলেও এর আখ্যানে লুকিয়ে রয়েছে গভীর জীবনসংগ্রাম এবং শেকড়ের টান। খুলনার কলাপোতা গ্রামের এক কিশোরী ইন্দুবালার অতীত জীবন এবং কলকাতার প্রতিকূল পরিবেশে এক নারীর টিকে থাকার লড়াইয়ের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে এই উপন্যাসে। লেখকের মুনশিয়ানায় প্রতিটি পৃষ্ঠায় ফুটে উঠেছে বাঙালি হেঁশেলের চিরচেনা গন্ধ এবং জীবনের নির্মম বাস্তবতার চিত্র।
বইটিতে মোট আটটি অধ্যায় রয়েছে, যার প্রতিটির নামকরণ করা হয়েছে জনপ্রিয় সব বাঙালি পদের নামে। যেমন—‘কুমড়ো ফুলের বড়া’, ‘বিউলির ডাল’ ইত্যাদি। এই অভিনব নামকরণের মধ্য দিয়ে রন্ধনশিল্পের সঙ্গে ইন্দুবালার জীবনের না বলা গল্প ও সংগ্রামের ইতিহাস নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। কিশোর বয়সে খুলনার গ্রাম থেকে কলকাতার এক বিপত্নীক ও মদ্যপ ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর ইন্দুবালার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ একা ও দিশাহারা হয়ে পড়া ইন্দুবালা কলকাতার একটি সরু গলির পুরোনো বাড়িতে গড়ে তোলেন ভাতের হোটেল। এই হোটেলটি কেবল তাঁর জীবিকার মাধ্যমই ছিল না, বরং হয়ে উঠেছিল তাঁর আত্মপরিচয় ও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক।
পাঠচক্রে অংশগ্রহণকারী আলোচক আজিজ বিন আহম্মদ বলেন, ‘“ইন্দুবালা ভাতের হোটেল” আমাদের শিক্ষা দেয় যে জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিতে শূন্য থেকে আবারও নতুন করে পথচলা শুরু করা সম্ভব।’ লেখক কল্লোল লাহিড়ীর সাহিত্যশৈলী নিয়ে বলতে গিয়ে প্রণব চৌধুরী উল্লেখ করেন, বর্তমানের বর্ণনার ফাঁকে অতীতে ফিরে যাওয়া এবং দুই সময়ের মধ্যে নিপুণ সেতুবন্ধন তৈরির ক্ষেত্রে লেখক অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এছাড়া প্রত্যাশা তালুকদার তাঁর বক্তব্যে জানান, এই উপন্যাসটি পড়ার সময় পাঠক কেবল দর্শক হয়ে থাকেন না, বরং তাঁরা ইন্দুবালার আবেগ, আনন্দ ও বেদনার জগতে সরাসরি প্রবেশ করেন।
অনুষ্ঠানে সিলেট বন্ধুসভার অন্যান্য সদস্য ও পাঠকদের সক্রিয় উপস্থিতি পুরো আসরকে প্রাণবন্ত করে তোলে। উপস্থিত ছিলেন দেব রায় সৌমেন, শেখ ফয়সাল আহমেদ, সূবর্ণা দেব, সমরজিৎ হালদার, শ্রেয়ান ঘোষ, কৃত্য ছত্রী, সাজন বিশ্বাস, সৌম্য মণ্ডল, ধীমহি ধৃতি, সুমন দাস, জামিউল হাসান, অমিত দেবনাথ, প্রাণেশ দাস, আহসান উল্লাহ খান, শুভ তালুকদার, এবং নয়ন হাজরার মতো নিবেদিতপ্রাণ বন্ধুরা। সমাপনী বক্তব্যে আয়োজকরা জানান, এ ধরনের সাহিত্যচর্চা ও পাঠচক্র তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পঠন সংস্কৃতি জোরদার করার পাশাপাশি মানবিক ও মননশীল মূল্যবোধ জাগ্রত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।