কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং বাজারে গত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে ঐতিহ্য ধরে রেখে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু রসগোল্লা। এখানকার বিখ্যাত ‘পাল মিষ্টি ভান্ডার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ৮২ বছর বয়সী উষা রঞ্জন পাল এখনো নিজ হাতে নিখুঁত কারিগরি ও পুরোনো পদ্ধতিতে রসগোল্লা তৈরি করে চলেছেন। আধুনিকতার এই যুগেও কাঠের চুলার মৃদু আগুনে মাটির হাঁড়িতে তৈরি এই রসগোল্লার কদর কমেনি একটুও। বিশেষ করে কেজির মাপের পরিবর্তে প্রতি পিস ১২ টাকা দামে বিক্রির এই ব্যতিক্রমী নিয়ম ক্রেতাদের মধ্যে বেশ কৌতূহল ও আকর্ষণের জন্ম দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৫৮ মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে হারবাং বাজারের রেবতী দত্তের মিষ্টির দোকানে কাজ শুরু করেছিলেন উষা রঞ্জন পাল। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে নিজের জমানো সঞ্চয় দিয়ে দোকানটি কিনে নাম দেন ‘পাল মিষ্টি ভান্ডার’। সেই থেকে শুরু করে দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তিনি এই মিষ্টি তৈরির ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। তাঁর দোকানে কেবল রসগোল্লা এবং মুচমুচে নিমকি পাওয়া যায়। এখানকার রসগোল্লা তৈরির মূল উপাদান হলো খাঁটি দুধের ছানা, সামান্য ময়দা, চিনি ও এলাচ। এক কেজি ছানার সঙ্গে মাত্র কুড়ি গ্রাম ময়দা মিশিয়ে মাটির চুলায় কাঠের আগুনে দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দিয়ে এই বিশেষ রসগোল্লা প্রস্তুত করা হয়। মানের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস না করায় এখানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ মিষ্টি তৈরি হয়, যা পাওয়ার জন্য ক্রেতাদের লম্বা লাইনে অপেক্ষা করতে হয়।

চকরিয়া ছাড়াও লোহাগাড়া, পেকুয়া, সাতকানিয়া ও লামা উপজেলা থেকে দূর-দূরান্তের মানুষ ছুটে আসেন এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির স্বাদ নিতে। এমনকি স্থানীয় তরুণ সমাজ ও মোটরসাইকেল আরোহীরা বিকেলবেলা নিয়মিত আড্ডা জমান এই দোকানে। দোকানের তিন জন কর্মচারী থাকলেও উষা রঞ্জন পাল নিজে প্রতিদিন কারখানায় উপস্থিত থেকে ছানার মান, চিনির রস এবং চুলার জ্বাল পরীক্ষা করেন। তাঁর তিন সন্তান নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত—দুই ছেলে চাকরিজীবী এবং মেয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক—তাও বয়সের ভার উপেক্ষা করে তিনি দোকানকে আঁকড়ে ধরে আছেন। এই মিষ্টির দোকান তাঁর কাছে কেবল জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, বরং এটি তাঁর পাঁচ দশকের ভালোবাসা, সাধনা এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক।