বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, হত্যা, আত্মহত্যা ও যৌন হয়রানির মতো ঘটনাগুলোর পরিসংখ্যান সমাজের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে কন্যাশিশুরা বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকিতে রয়েছে সবচেয়ে বেশি, আর প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, তদন্ত প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রভাবশালী মহলের অনৈতিক হস্তক্ষেপে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যা এ ধরনের নৃশংসতা বৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা পালন করছে।

রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন চিত্র–২০২৫’ শীর্ষক এই সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম। ১৪টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তৈরি এই সমীক্ষায় দেশের সার্বিক সামাজিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা আফরুজা আরমান বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে জানান যে, বয়সভিত্তিক ও পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারী ও মেয়েরা আজ নানাভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, দলবদ্ধ ধর্ষণ, আত্মহত্যা এবং ধর্ষণচেষ্টার মতো অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে কন্যাশিশুরা সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে, প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা খুনের শিকার হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনাও প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হারে ঘটছে। পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গৃহিণীরা হত্যা, আত্মহত্যা এবং যৌতুকজনিত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন সর্বাধিক সংখ্যায়। একইভাবে শিক্ষার্থী কন্যাশিশুরাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা এর আশপাশে নানাভাবে হেনস্তা ও দলবদ্ধ ধর্ষণের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ঘর এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—উভয় স্থানই ধীরে ধীরে নারী ও শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এই ক্রমবর্ধমান অপরাধের পেছনে বিচারহীনতার পরিবেশ এবং অপরাধীদের সামাজিক দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে প্রধান দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করেছে মহিলা পরিষদ। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে সালিসির মাধ্যমে বড় ধরনের অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা অপরাধপ্রবণতাকে আরও উসকে দিচ্ছে। সভাপতির বক্তব্যে ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ছয় বছরের শিশু থেকে শুরু করে প্রবীণ নারী পর্যন্ত কেউই এই সহিংসতার আওতার বাইরে নন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, অপরাধের জন্য কখনোই ভুক্তভোগী নারী বা শিশু দায়ী হতে পারে না; বরং অপরাধী এবং তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া সামাজিক মানসিকতাই এর জন্য দায়ী।

নারী নির্যাতনকে কেবল একটি সাধারণ অপরাধ হিসেবে না দেখে এটিকে জাতীয় নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং সামগ্রিক সমাজের নৈতিক সংকটের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে বলে মন্তব্য করেন বক্তারা। সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপরও জোর দেওয়া হয়। শুধুমাত্র ঘটনার পুনরাবৃত্তি না করে অপরাধের কাঠামোগত ও সামাজিক কারণগুলো তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে কার্যকর আইন প্রণয়ন, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করা এবং সমাজে নারী ও কন্যাশিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।