সরকারি কলেজের শিক্ষক এবং শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের একচেটিয়া নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতদিন পর্যন্ত বদলি ও পদায়নের এই সম্পূর্ণ ক্ষমতা এককভাবে মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত থাকলেও, এখন তা বিকেন্দ্রীকরণ করে একটি নতুন ও সুশৃঙ্খল কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পদমর্যাদার ভিত্তিতে শিক্ষকদের বদলি ও পদায়নের কাজটি সম্পন্ন করতে তিনটি আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা শিক্ষা প্রশাসনের দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী নীতিমালা জারি করে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক এই নতুন নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বর্তমানে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে প্রায় ১৬ হাজার কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। এতদিন এই বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তার বদলির জন্য সরাসরি মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে হতো, যার ফলে নানা ধরনের প্রশাসনিক জট ও ভোগান্তির সৃষ্টি হতো। নতুন এই বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়ার ফলে শিক্ষকদের অযথা হয়রানি যেমন কমবে, তেমনি বদলি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষক নেতারা ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, পদভেদে বদলির ক্ষমতা তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম স্তরে, সরকারি কলেজের প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকদের বদলি এবং পদায়নের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালকদের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক, জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) এবং আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (কলেজ) সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অধীন কলেজগুলোর প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকরা এই কমিটির মাধ্যমেই বদলির আবেদন ও অনুমোদন পাবেন।

দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপকদের বদলি প্রক্রিয়া। এই কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কলেজ শাখার সংশ্লিষ্ট উপসচিব এবং মাউশির সহকারী পরিচালক (কলেজ), যিনি সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। ঢাকা মহানগর এবং নির্দিষ্ট দপ্তর ও সংস্থার পদ বাদে অন্যান্য অঞ্চলের সহযোগী অধ্যাপকদের বদলি ও পদায়নের সিদ্ধান্ত নেবে এই কমিটি।

সবচেয়ে উর্ধ্বতন এবং তৃতীয় স্তরের কমিটি গঠিত হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে। এই উচ্চপর্যায়ের কমিটি সহযোগী অধ্যাপক, অধ্যাপক, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থার সব উচ্চপদ এবং সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদের বদলি ও পদায়ন সংক্রান্ত আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত আদেশ জারি করবে। এই কমিটিতে অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) এবং যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

তবে এই নতুন বদলি নীতিমালার সুফল পেতে শিক্ষকদের বেশ কিছু নির্দিষ্ট শর্ত ও নিয়ম মেনে চলতে হবে। নীতিমালায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো প্রভাষক বা শিক্ষক চাকরিতে যোগদানের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে সাধারণত বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন না। একইভাবে অন্যান্য শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একই কর্মস্থলে দুই বছর পূর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে কোনো কর্মকর্তার ক্ষেত্রে গুরুতর শারীরিক, মানসিক কিংবা পারিবারিক জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে, বিশেষ বিবেচনায় দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই আবেদনের সুযোগ রাখা হয়েছে, যার যৌক্তিকতা যাচাইয়ের পূর্ণ এখতিয়ার সরকারের হাতে সংরক্ষিত থাকবে।

এছাড়া স্বামী-স্ত্রী উভয়েই চাকরিজীবী হলে, তাঁদের ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর কর্মস্থল কিংবা তার নিকটবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বদলির অগ্রাধিকার দিয়ে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার এক বছর পূর্বে কোনো কর্মকর্তা তাঁর সুবিধাজনক স্থানে বদলির আবেদন করলে, শূন্য পদ সাপেক্ষে তাঁকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বদলি মূল্যায়নের সময় আবেদনকারীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জটিলতা, পেশাগত সমস্যা, দুরারোগ্য ব্যাধি এবং নিজ জেলা থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল বা উপজেলা পর্যায়ের শূন্য পদগুলোতে মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদায়ন করা হবে, যাতে সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন ঘটে।