কথাসাহিত্যিক রাহিতুল ইসলামের অনুপ্রেরণাদায়ক উপন্যাস ‘অর্পা’কে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে অনুষ্ঠিত হয়েছে ভৈরব বন্ধুসভার ২০৬তম পাঠচক্রের বিশেষ আসর। জীবনের নানা প্রতিকূলতা, পারিবারিক সংকট ও স্বজন হারানোর গভীর বেদনা কাটিয়ে অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে কীভাবে একজন নারী নিজের স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে পারেন, উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে সেই গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো আলোচনায় তুলে আনেন বক্তারা। শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোর ভৈরব কার্যালয়ে আয়োজিত এই সাহিত্যভিত্তিক আসরে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্পার লড়াইকে এক দৃষ্টান্তমূলক অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করা হয়।

পাঠচক্রে আলোচকেরা উপন্যাসের মূল চরিত্র অর্পার জীবনসংগ্রাম ও তার আত্মবিশ্বাসের বহুমাত্রিক রূপ ফুটিয়ে তোলেন। অর্পার বাবা মারা যাওয়ার পর তার শিক্ষাজীবন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক নানা বাধাবিপত্তি তার অগ্রযাত্রাকে থমকে দিতে চেয়েছিল। তবে জীবনের এমন করুণ ট্র্যাজেডির সামনে সমর্পিত না হয়ে অর্পা তার সহজাত দক্ষতা ও ভালোবাসার জায়গা—রান্নাকে কেন্দ্র করে ঘুরে দাঁড়ায়। সাধারণ গৃহস্থালি পরিমণ্ডলের গণ্ডি পেরিয়ে রন্ধনশিল্পকে একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা ও ব্যবসা উদ্যোগে রূপান্তরের যে লড়াই সে চালিয়েছে, তা সমকালীন তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রেরণার এক অমূল্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

এবারের পাঠচক্রের আসরে মূল আলোচনার দায়িত্বে ছিলেন সংগঠনের সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোশারফ রাব্বি, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক হেপী বেগম এবং পাঠচক্র ও পাঠাগার সম্পাদক মহিমা মেধা। এর মধ্যে মোশারফ রাব্বি এবং হেপী বেগম প্রথমবারের মতো প্রধান আলোচক হিসেবে নিজেদের চিন্তাশীল বক্তব্য তুলে ধরে নতুন ধারার উন্মেষ ঘটান। বক্তারা বলেন, অর্পার গল্পটি শুধু একটি কাল্পনিক চরিত্র বা কাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত আমাদের সমাজের সেই সব সংগ্রামী নারীদের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা চরম বিপদের মুখেও নিজেদের সততা ও কর্মপ্রচেষ্টা বজায় রেখে সফলতা ছিনিয়ে আনেন।

অনুষ্ঠানে সমাপনী ও সমাদরমূলক বক্তব্য দেন ভৈরব বন্ধুসভার সভাপতি জান্নাতুল মিশু এবং সাধারণ সম্পাদক জিসানউল্লাহ আনাস। তাঁরা নতুন দুই আলোচকের চমৎকার উপস্থাপনা ও বিশ্লেষণের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে তাঁদের এমন বৌদ্ধিক চর্চা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পাঠচক্রের ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোকপাত করে বক্তব্য দেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক ও ভৈরব বন্ধুসভার উপদেষ্টা সুমন মোল্লা। তিনি মন্তব্য করেন, নিয়মিত পাঠচক্র আয়োজনের মূল লক্ষ্য কেবল বই পাঠেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি তরুণদের ভেতরে থাকা জড়তা দূর করে তাদের মুক্তচিন্তা প্রকাশ ও বক্তব্য প্রদানে আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলে।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত থেকে আলোচনায় অংশ নেন সহসভাপতি আফিসা আলী, যৌথ সাধারণ সম্পাদক নাফিস রহমান ও রাসেল রাজ, প্রচার সম্পাদক মাজহারুল ইফতি, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক আফিফুল ইসলাম, বইমেলা সম্পাদক মাহমুদুল হাসান এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সম্পাদক প্রীতি। এ ছাড়া বন্ধু জিসান, তুহিন আরবী, শিমু ও ওহীসহ অন্যান্য শুভানুধ্যায়ীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাঠচক্রের এই পর্বে উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, এই ধরনের নিয়মিত পাঠচক্রের মাধ্যমে যুবসমাজ সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি নিজেদের মেধা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়াতে সক্ষম হবে।