চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাসসংকটের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় দীর্ঘ সময় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় রান্না করা তো দূরের কথা, শিশুদের খাবার প্রস্তুত করা কিংবা খাওয়ার পানি ফুটিয়ে নেওয়ার মতো মৌলিক কাজগুলোও ব্যাহত হচ্ছে। গত রোববার নগরীর আগ্রাবাদ, হালিশহর, খাজা রোডসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের দীর্ঘ সময় ধরে চুলায় আগুন না জ্বলার কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়। সকাল থেকে শুরু হওয়া এই অপেক্ষায় দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেলেও গ্যাস না আসায় অনেক পরিবার হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে বাধ্য হয়েছেন অথবা না খেয়ে দিন কাটিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছুটির দিন কিংবা কর্মদিবস—সবক্ষেত্রেই রান্নার প্রধান মাধ্যম হলো পাইপলাইনের গ্যাস। কিন্তু হঠাৎ করে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া বা চরম চাপ কমে যাওয়ার কারণে গৃহিণীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। আগ্রাবাদের হাজিপাড়া এলাকার বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী আমেনা বেগমের পরিবারে এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল রোববার সকাল থেকেই। ভাত রান্নার প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পরপরই সকাল ১০টার দিকে চুলা নিভে যায়। এরপর দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর বিকেলে গ্যাস আসলেও চাপ এত কম ছিল যে உடனடியாக রান্না শুরু করা সম্ভব হয়নি। একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন একই এলাকার আরেক বাসিন্দা রোকেয়া আক্তার, যার পরিবারে দুটি ছোট শিশু রয়েছে। সময়মতো পানি ফোটাতে না পারায় এবং বাচ্চাদের খাবার তৈরি করতে না পারায় পুরো পরিবারকে মারাত্মক সংকটে পড়তে হয়।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান গ্যাসসংকটের মূল কারণ হলো জাতীয় গ্রিডে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহ কমে যাওয়া। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরও শোচনীয় রূপ নিয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়েছে শিল্প ও আবাসিক উভয় খাতের ওপর। কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)-এর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে প্রতিদিনের যে চাহিদা রয়েছে, তার তুলনায় অনেক কম গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদার তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘাটতি থাকায় পাইপলাইনের চাপ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ফলে শিল্পকারখানার ক্যাপটিভ পাওয়ারে গ্যাসের চাপ কমানোর পাশাপাশি আবাসিক এলাকার সংযোগগুলোতেও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, চট্টগ্রামে গ্যাসের চাপ কমার সমস্যা নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকট তীব্র রূপ ধারণ করেছে। আগে কম চাপে কোনোমতে রান্নার কাজ চালিয়ে নেওয়া গেলেও এখন দিনের বড় একটা সময় গ্যাস একেবারেই থাকছে না। হালিশহরের রঙ্গিপাড়া কিংবা খাজা রোডের শাহ ওয়ালীউল্লাহ আবাসিক এলাকার বাসিন্দারাও একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। অনেক পরিবারকে দুপুরের খাবার খেতে হয়েছে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার উপক্রম হলে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে কেজিডিসিএল বা দায়িত্বশীল কোনো কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা না দেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

তবে এই সংকট নিরসনে দ্রুত কাজ চলছে বলে জানিয়েছে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। প্রতিষ্ঠানটির এলএনজি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মার্কিন এক্সিলারেট এলএনজি টার্মিনাল পুনরায় পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার জন্য বিশেষজ্ঞ কারিগরি দল নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। খুব দ্রুতই টার্মিনালের ত্রুটি সারিয়ে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই আশ্বাসের দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন চট্টগ্রাম নগরের লাখো ভুক্তভোগী মানুষ, যারা প্রতিদিনের রান্নার মতো অতি প্রয়োজনীয় কাজটি সম্পন্ন করার জন্য গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।