মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জেরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত এক নতুন মোড় নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখতে এবং তেহরানকে সমঝোতার টেবিলে বসার পর্যাপ্ত সুযোগ করে দিতে ইরানে গত দুই রাত ধরে বিমান হামলা স্থগিত রেখেছেন। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ এক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউস বর্তমান সংকট নিরসনে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে অগ্রাধিকার দিতে চায়। তবে ওয়াশিংটন কোনোভাবেই তাদের কৌশলগত অবস্থান থেকে সরে আসেনি এবং প্রেসিডেন্টের টেবিলে সব বিকল্পই খোলা রয়েছে।
গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালির নিরাপদ চলাচল এবং সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার কথা ছিল। কিন্তু চলতি মাসের শুরুতে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। এর জের ধরে গত ১৩ জুলাই থেকে মার্কিন বাহিনী ইরানি ভূখণ্ডে পুনরায় তীব্র বিমান হামলা শুরু করে এবং বন্দরগুলোতে কঠোর নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করে। অন্যদিকে, তেহরানও এই আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা রকেট ও ড্রোন হামলা চালায়। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় উভয় পক্ষেরই উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক এই সংঘাতে ইতোমধ্যে চার মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণায় ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। তেহরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই বিরতির সময়কালে তারাও আঞ্চলিক বিভিন্ন পয়েন্টে প্রতিশোধমূলক কার্যক্রম স্থগিত রেখেছেন। এর অংশ হিসেবে ওমান ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে তেহরানে গত শুক্রবার ও শনিবার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আশা প্রকাশ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এই সংকটের একটি স্থায়ী ও কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি বিরোধ এখনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পথে অন্যতম বড় অন্তরায় হিসেবে রয়ে গেছে।
অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদী এই সংঘাতে ওয়াশিংটনের আকাশপ্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও অত্যাধুনিক গোলাবারুদের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনকে হামলা থমকে দিতে বাধ্য করেছে। তবে এই অভিযোগ কঠোরভাবে নাকচ করে দিয়েছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো সামরিক অভিযান পরিচালনা করার জন্য মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর কাছে পর্যাপ্ত রসদ ও কৌশলগত প্রস্তুতি রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান এই বিরতি হয়তো দীর্ঘস্থায়ী কোনো শান্তি চুক্তির সূচনা করবে অথবা এটি বড় ধরনের কোনো সামরিক অভিযানের আগের সাময়িক নীরবতা মাত্র। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।