আধুনিক এই ব্যস্ততম যান্ত্রিক জীবনে মানুষের মনের ওপর চাপ, মানসিক উদ্বেগ এবং নানামুখী দুশ্চিন্তা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মনকে শান্ত রাখতে এবং আত্মিক প্রশান্তি অর্জনে ইসলাম ধর্মে নির্দেশিত বিভিন্ন আমলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি ও সর্বশ্রেষ্ঠ আমল হলো মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর ওপর দরুদ শরিফ পাঠ করা। ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ও অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করার মাধ্যমে কেবল পরকালের মুক্তিই নিশ্চিত হয় না, বরং এটি পার্থিব জীবনের সকল ধরনের দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা ও সংকটের কার্যকর সমাধান হিসেবে কাজ করে।
ইসলামের পরিভাষায় দরুদ শরিফ অর্থ হলো আল্লাহর দরবারে মহানবী (সা.)–এর প্রতি রহমত ও বরকত কামনার বিশেষ প্রার্থনা। পবিত্র কোরআন মজিদের সুরা আহজাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং এবং তাঁর ফেরেশতাকুল প্রিয় নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন উল্লেখ করে মুমিন বান্দাদেরও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিস শরিফেও নবী করিম (সা.) তাঁর উম্মতকে নিয়মিত এবং বিশেষ করে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন জুমাবারে অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করার তাগিদ দিয়েছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ ও তিরমিজির বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, বান্দা যখনই দরুদ পাঠ করে, তা সরাসরি নিখুঁতভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
দরুদ পাঠের অভূতপূর্ব ফজিলত সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি একবার নিষ্ঠার সাথে দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর সরাসরি দশবার রহমত নাজিল করেন। তাছাড়া মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির এক অনন্য ইতিহাস রয়েছে প্রখ্যাত সাহাবি হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.)–এর জীবনে। তিনি রাসুলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি তার ইবাদতের কতটুকু সময় দরুদ পাঠের জন্য নির্ধারণ করবেন। একপর্যায়ে তিনি যখন সম্পূর্ণ সময়টাই দরুদ পাঠে উৎসর্গ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, তখন রাসুল (সা.) তাঁকে সুসংবাদ দিয়ে বলেন যে, এটিই তার জীবনের যাবতীয় দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি দূর করার জন্য এবং তার অতীতের সমস্ত পাপ ক্ষমা করিয়ে নেওয়ার জন্য পুরোপুরি যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে।
পরকালীন মুক্তির ক্ষেত্রেও দরুদ শরিফের গুরুত্ব অপরিসীম। কেয়ামতের ভয়াবহ ও কঠিন পরিস্থিতিতে সেই ব্যক্তিই মহানবী (সা.)–এর সবচেয়ে নিকবর্তী সান্নিধ্য লাভ করবেন, যিনি দুনিয়ার জীবনে তাঁর ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করতেন। ইসলামি চিন্তাবিদ ও মুহাদ্দিসরা মনে করেন, দৈনন্দিন জীবনের হাঁপিয়ে ওঠা কর্মব্যস্ততায় কিংবা গভীর মানসিক অবসাদে যারা নিয়মিত দরুদ শরিফ আমল করেন, তাদের অন্তরে এক অদ্ভুত ও প্রশান্তিদায়ক শক্তির সঞ্চার হয়। এটি একদিকে যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম, অন্যদিকে তেমনি জাগতিক সব হতাশা ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়ার এক দিব্য ও অলৌকিক চাবিকাঠি।