পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে আসন্ন আইনসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট তীব্র রাজনৈতিক সংকট ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে পুরো অঞ্চলজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় আইনসভার নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অধিকারকর্মী ও সাধারণ বিক্ষোভকারীদের মধ্যে চলা দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষে এ পর্যন্ত অন্তত ৪০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে বড় একটি অংশ বিক্ষোভকারী হলেও বেশ কয়েকজন পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন। রাওয়ালাকোটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন মানবাধিকার সংগঠনগুলো। মূলত গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা শরণার্থী কোটার আসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থেকেই এই গণআন্দোলন এবং পরবর্তীতে প্রাণঘাতী সহিংসতার সূত্রপাত হয়েছে।
১৯৭০-এর দশকে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের জন্য আইনসভার ৫৩টি আসনের মধ্যে ১২টি আসন সংরক্ষিত রাখার নিয়ম চালু করা হয়। ওই সময়কার নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ্য ছিল, ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ মীমাংসার পর এসব মানুষ যেন নিজভূমে ফিরে যাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, সংরক্ষিত এসব আসনের বিপরীতে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের অনেকেই ওই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন না। এর ফলে স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দারা ওই ১২টি আসনে প্রার্থী হওয়ার বা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলেছে অধিকারকর্মী গোষ্ঠীগুলোর জোট জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)।
জনগণের এই ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার পরিবর্তে পাকিস্তান সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় জেএএসিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং কঠোরহস্তে আন্দোলন দমনের পথ বেছে নেয়। সরকারের এমন কঠোর নীতির কারণে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। বিক্ষোভ দমনের নামে নির্বিচারে শক্তি প্রয়োগের ফলে রাওয়ালাকোটসহ বিভিন্ন স্থানে মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। শিক্ষা বিভাগের কর্মী নাকাশ জারদাদের মতো সাধারণ মানুষও এই সংঘাতের বলি হয়েছেন, যিনি কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিতে নিহত হন। সহিংসতার এই ঢেউয়ের মধ্যে প্রার্থীরাও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক জনসভা বা গণসংযোগের পরিবর্তে প্রার্থীরা এখন ঘরোয়া বৈঠক কিংবা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। কোথাও কোথাও প্রার্থীদের গাড়ি ও প্রচারণায় হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
পরিস্থিতির এমন চরম অবনতির পরও পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত তিন ধাপে নির্বাচন চালিয়ে যাওয়ার অনড় অবস্থানে রয়েছে, যার প্রথম ধাপ শুরু হওয়ার কথা ২৭ জুলাই। সরকারের কাশ্মীরবিষয়ক মন্ত্রী আমির মুকাম দাবি করেছেন, সব ধরনের বাধা সত্ত্বেও নির্বাচন আয়োজন করাই সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ। তাঁর মতে, অল্প কিছু মানুষের হাতে ক্ষমতা সীমিত না রেখে লাখ লাখ সাধারণ কাশ্মীরি ভোটারের হাতেই তাদের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার অধিকার ছেড়ে দেওয়া উচিত। তবে মুজাফফরাবাদ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক প্রধান জাহিদ আমিনসহ স্থানীয় বিশিষ্টজনদের অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান ভয়ভীতি ও সংঘাতের পরিবেশে সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন প্রায় অসম্ভব।
এই অভ্যন্তরীণ সংকটের আন্তর্জাতিক প্রভাবও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টুর্ক অবিলম্বে সকল মৃত্যুর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন এবং জেএএসিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, নাগরিক সমাজের ওপর এ ধরনের দমনপীড়ন মানুষের মৌলিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। অন্যদিকে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত এই সহিংসতার জন্য পাকিস্তানের দশকের পর দশক ধরে চলা কাঠামোগত শোষণ ও মৌলিক অধিকার হরণকেই দায়ী করেছে। তবে পাকিস্তানের পিপিপির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো ভারতের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে একটি সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি, পুরো অঞ্চলে প্রায় ৪০ দিন ধরে ইন্টারনেট ও মোবাইল সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখাকে গোটা জনগোষ্ঠীর ওপর এক ধরনের সামষ্টিক শাস্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে এক অনিশ্চিত ও আতঙ্কজনক ভবিষ্যতের মধ্য দিয়েই পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ভোটাররা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।