রাজধানী ঢাকার সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের সম্মেলন কক্ষে সাহিত্যপ্রেমী ও লেখকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে মুক্ত সাহিত্যচর্চার জনপ্রিয় উদ্যোগ ‘পরমকথা’র ৭৯তম আসর। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই কেবল কথাসাহিত্য কেন্দ্রিক ভাবনার বিকাশ ও উন্মুক্ত আলোচনার অভিপ্রায়ে এই আসরের আয়োজন করা হয়। দেশবরেণ্য গল্পকার, ঔপন্যাসিক, সাহিত্য সমালোচক এবং একদল মননশীল পাঠকের নিখাদ সাহিত্যপ্রেমের এক অসাধারণ মেলবন্ধন দেখা যায় পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে।
পরমকথার এই বিশেষ আসরে নিজেদের সদ্যরচিত গল্প পাঠ করে শোনান বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক আবুল ইসলাম শিকদার এবং প্রখ্যাত ছড়াকার ও থিয়েটারকর্মী মাহবুবা হক কুমকুম। উপস্থাপিত গল্প দুটি ছিল স্বকীয় শৈলী ও ভিন্ন জীবনবোধে উজ্জ্বল। একটি গল্পে নাগরিক মানস ও আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার রূপায়ন যেমন ফুটে উঠেছিল, তেমনি অপর গল্পে ছন্দের দোলা ও নাট্যীয় বিন্যাসে জীবনসত্যকে ফুটিয়ে তোলা হয়। ভিন্ন স্বরের এই দুই গল্প উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে উপস্থিত শ্রোতাদের সামনে সাহিত্য পাঠের নবতর এক দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচিত হয়।
পাঠ পর্ব সমাপনান্তে আয়োজিত হয় উন্মুক্ত পর্যালোচনা সভা। পরমকথার মূল আকর্ষণ হলো এর সুগঠনমূলক ও নিরপেক্ষ আলোচনার ধারা। উপস্থিত প্রবীণ ও নবীন সাহিত্যবোদ্ধারা গল্পের ভাষা, চরিত্র সৃষ্টি, আখ্যানের গঠন এবং অন্তর্নিহিত জীবনদর্শনের নানা দিক উন্মোচন করেন। সভায় ইতিবাচক প্রশংসার পাশাপাশি গল্প দুটির গঠনগত দুর্বলতা বা উন্নয়নমূলক দিকগুলোও নির্দ্বিধায় তুলে ধরা হয়। কোনো রকম ব্যক্তিগত আঘাত ব্যতিরেকে কেবল সাহিত্যের মানোন্নয়ন ও একজন লেখকের পাশে অপর লেখকের সৌহার্দ্যপূর্ণ সহযোগিতার মনোভাবই এই আলোচনার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে যেখানে মানুষের মধ্যে গভীর বই পাঠ ও সাহিত্য চর্চার অভ্যাস ক্রমশ কমে আসছে, সেখানে পরমকথার মতো আয়োজনগুলো নতুন সম্ভাবনার পথ দেখাচ্ছে। সংগঠনটির অন্যতম বিশেষত্ব হলো প্রবীণ ও নবীন লেখকদের মধ্যকার দূরত্বের অমিল ঘটিয়ে এক সমতাভিত্তিক মুক্তমঞ্চ তৈরি করা। এখানে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক ও উদীয়মান গল্পকার সমান মর্যাদা নিয়ে একই বৃত্তে অবস্থান করেন। ফলে আয়োজনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক গল্প পাঠের স্থান না হয়ে সাহিত্যপ্রেমীদের এক নিবিড় পরিবারে পরিণত হয়েছে।
আয়োজক ও অংশগ্রহণকারী সাহিত্যিকদের মতে, একটি মানসম্মত সাহিত্য সৃষ্টি কেবল লেখালেখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পাঠ, যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন ও গঠনমূলক সমালোচনার মধ্য দিয়েই তার প্রকৃত বিকাশ ঘটে। পরমকথার এই ধারাবাহিক আয়োজন বাংলা কথাসাহিত্যের গতিকে আরও বেগবান করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের পাঠকদের মধ্যে শিল্পসাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ সৃষ্টিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে বলে বিশিষ্টজনেরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।