ইসলাম ধর্মে পিতা-মাতার অধিকার ও মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত। পবিত্র কোরআন এবং হাদিসের বিভিন্ন নির্দেশনায় সন্তানের জীবনে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে এবং নৈতিক সমাজ গঠনে মা-বাবার সেবা ও তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিকল্প নেই। কোরআনের বাণীর আলোকেও মা-বাবার ৮টি গুরুত্বপূর্ণ অধিকারের বিষয়টি বারবার গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।

প্রথমত, পিতা-মাতার প্রতি সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার এবং তাদের আনুগত্য প্রকাশ করা প্রত্যেক সন্তানের প্রধান দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনের সুরা বনি ইসরাইলের ২৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ একত্ববাদের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার আদেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে মা-বাবার সম্মান ও আনুগত্যকে ইবাদতের সমান্তরালে স্থান দেওয়া হয়েছে। হাদিস শরিফেও আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমলের তালিকার ঠিক পরেই মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতীয় ও তৃতীয়ত, বার্ধক্যে উপনীত পিতা-মাতার সামনে ‘উফ’ শব্দটিও উচ্চারণ না করা এবং তাদের কখনো ধমক বা অসম্মান না করা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মা-বাবার আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে কিংবা তারা বারবার একই কথা বলতে পারেন, যা অনেক সময় সন্তানদের মধ্যে বিরক্তির সৃষ্টি করে। ইসলাম এই সামান্য বিরক্তি প্রকাশকেও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। উচ্চস্বরে কথা বলা, অপমান করা বা কটূক্তি করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। ইসলামি শরিয়তে মা-বাবার প্রতি বিনয়ী হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, তাদের সঙ্গে সর্বদা নম্র ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে হবে।

চতুর্থ ও পঞ্চম নির্দেশনায় এসেছে তাঁদের সঙ্গে উত্তম আচরণ এবং নিজেদের অহংকার বিসর্জন দিয়ে মমতার ডানা অবনত করার কথা। তাবেয়ি সাইদ ইবনে মুসাইয়্যিবের মতে, একজন অনুগত দাস যেভাবে কঠোর প্রভুর সামনে ভয়ে ও বিনয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, মা-বাবার সামনে সন্তানকে তেমনই বিনম্র হতে হবে। ষষ্ঠত, মা-বাবার জন্য প্রতিনিয়ত দোয়া করা সন্তানের অপরিসীম দায়িত্ব। মানুষের পক্ষে মা-বাবার ত্যাগের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া অসম্ভব, তাই তাদের জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর আল্লাহর দরবারে তাদের ক্ষমা ও রহমতের জন্য দোয়া করতে হবে।

সপ্তমত, অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলার শোকরিয়া আদায়ের পাশাপাশি মা-বাবার শুকরিয়া আদায় করার নির্দেশ রয়েছে সুরা লুকমানে। একজন মা গর্ভাবস্থার কষ্ট এবং বাবা সন্তানের ভরণপোষণের জন্য যেভাবে নিরলস পরিশ্রম করেন, তা অতুলনীয়। অষ্টম ও সর্বশেষ বিষয় হলো—পিতা-মাতা ভিন্ন ধর্ম বা আদর্শের অনুসারী হলেও পার্থিব জীবনে তাদের সঙ্গে সদাচরণ বজায় রাখা। তবে স্রষ্টার অবাধ্যতার নির্দেশ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে তাদের সেবা ও সাহযোগিতা করা সন্তানের অবশ্যকর্তব্য। এই চিরন্তন নির্দেশগুলো পালনের মাধ্যমেই একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল এবং পরোপকারী সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।