গ্রীষ্মকালীন ছুটির ভরা মৌসুমের মধ্যেই ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন দাবানল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস ও সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্রুত বিস্তার লাভ করা এই বিধ্বংসী আগুন ফ্রান্সের বোর্দো এবং স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের মতো প্রধান বড় শহরগুলোর দিকে বিপজ্জনকভাবে এগিয়ে আসছে। তীব্র তাপপ্রবাহ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতিশীল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে চরম সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
শনিবার পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষকে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অথবা তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বনাঞ্চলে প্রলয়ঙ্করী রূপ ধারণ করা এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে আকাশপথে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চলছে। বিশেষ করে একটি ‘এয়ারবাস এ৪০০এম’ সামরিক কার্গো বিমান ব্যবহার করে আকাশ থেকে লাল রঙের বিশেষ আগুন প্রতিরোধক রাসায়নিক ছেটানো হচ্ছে, যাতে আগুন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে না পারে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরোঁদ ও লোঁদ্ অঞ্চলের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এ পর্যন্ত শুধু এই অঞ্চলগুলো থেকেই প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই দাবানলে ইতোমধ্যে যে পরিমাণ বনভূমি ও জনপদ পুড়ে গেছে, তার আয়তন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের প্রায় তিন গুণের সমান। শুধু ফ্রান্স ও স্পেনেই নয়, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে ইতালি এবং স্কটল্যান্ডের কিছু অংশেও। সব মিলিয়ে ইউরোপের এই অঞ্চলে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ সরাসরি বাস্তুচ্যুত বা স্থানান্তরিত হয়েছেন।
তবে এই সার্বিক সংকট মোকাবিলায় কিছু আশার বাণী শুনিয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, আবহাওয়া পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন ঘটছে এবং তা ধীরে ধীরে উদ্ধারকর্মীদের অনুকূলে আসছে। চলতি সপ্তাহান্তটি আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। অন্যদিকে, ফ্রান্স তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে বিশাল কার্গো বিমান মোতায়েন করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশ থেকেও আন্তর্জাতিক সহায়তার বহর ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়েছে।
দাবানলের তীব্রতার কারণে সমগ্র ইউরোপজুড়ে জনজীবনে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটেছে। মহাদেশটির বিশাল অংশ এখন ঘন কালো ধোঁয়ায়াচ্ছন্ন। ব্যাপক হারে মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় প্রধান সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি ইউরোপের মর্যাদাপূর্ণ সাইক্লিং প্রতিযোগিতা ‘ট্যুর ডি ফ্রান্স’-এর চূড়ান্ত পর্বের রুট ও দৈর্ঘ্যও কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে আয়োজকরা। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহই বর্তমান এই ভয়াবহ দাবানলকে প্রধানত উসকে দিচ্ছে। অতিরিক্ত উষ্ণতা ও শুষ্ক আবহাওয়া প্রকৃতির আর্দ্রতা কেড়ে নেওয়ায় প্রতিবছরই দাবানলের মৌসুমটি আরও দীর্ঘ ও প্রলয়ঙ্করী হয়ে উঠছে।