বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে বড় ধরনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির চিত্র উন্মোচন করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। সম্প্রতি নির্ধারিত সফরসূচির অংশ হিসেবে সড়কপথে এই ৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতালে পৌঁছান তিনি। এ সময় তাঁর সঙ্গে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন এবং পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদারসহ স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনের শুরুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগ ঘুরে দেখেন এবং সেখানে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সাধারণ রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। এ সময় হাসপাতালের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে নানা অভিযোগের সত্যতা মিলতে শুরু করে। বিশেষ করে, হাসপাতালের একটি পরিত্যক্ত ভবনে প্রবেশ করে চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার উপক্রম হয় পরিদর্শকদের। সেখানে দেখা যায়, কয়েক লাখ টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। আরও বেশি বিস্ময়কর বিষয় হলো, একটি অব্যবহৃত শৌচাগার বা টয়লেটের ভেতরে বিপুল পরিমাণ সরকারি স্যালাইন, সিরিঞ্জ এবং নানা ধরনের চিকিৎসাসামগ্রী অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, হাসপাতালের ঠিক পাশেই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) কামাল হোসেন মুফতির নিজস্ব একটি বেসরকারি ক্লিনিক রয়েছে। এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে মন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে ওই ক্লিনিকে খোঁজখবর নেন এবং অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি দায়িত্ব অবহেলা ও ব্যক্তিগত ক্লিনিক বাণিজ্যের অভিযোগে টিএইচওকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেন তিনি। এছাড়া চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক হাজিরা যন্ত্রের তথ্য যাচাই করেন মন্ত্রী। এতে বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের নিয়মিত দেরিতে অফিসে আসার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
অনিয়মের এখানেই শেষ নয়; হাসপাতালের সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুল আলম কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় মন্ত্রী তাঁকে মুঠোফোনে কল করেন। সিভিল সার্জন জানান যে তিনি ছুটিতে আছেন। কিন্তু কার অনুমতিতে তিনি ছুটি নিয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছ থেকে মৌখিক অনুমতি নেওয়ার কথা জানান। তবে যোগাযোগ করা হলে খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ মো. মোশাররফ হোসেন সিভিল সার্জনের ছুটির বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এরপর স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে বিভাগীয় পরিচালককে মোরেলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করে এসব গুরুতর অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যেও প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মোরেলগঞ্জের বর্তমান ৫০ শয্যার হাসপাতালটিকে খুব শীঘ্রই ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে এবং এর জন্য দ্রুত দরপত্র আহ্বান করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, চার মাসের মধ্যে দেশের প্রতিটি কোণায় গিয়ে সব হাসপাতাল একবারে পরিদর্শন করা সম্ভব নয়, তবে যেসব স্থানে অনিয়মের অভিযোগ আসছে, তিনি স্বয়ং সেখানে গিয়ে তা খতিয়ে দেখছেন। আজকের পরিদর্শনের সব ত্রুটি-বিচ্যুতি নোট করা হয়েছে এবং ঢাকায় ফিরে ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে আলোচনা করে জনস্বার্থে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মোরেলগঞ্জ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী পার্শ্ববর্তী শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও ঘুরে দেখেন। সেখানে চিকিৎসাসেবার সার্বিক পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতায় সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি ওই এলাকার চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের জনবলসংকট দ্রুত সমাধানের কার্যকর আশ্বাস দেন। সরকারের এই নজিরবিহীন ও কঠোর পদক্ষেপে স্থানীয় স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতিবাজ মহলে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা দেখছে।