আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং যান্ত্রিক যানবাহনের আধিপত্যে যখন দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো লালমনিরহাট জেলা থেকেও প্যাডেলচালিত রিকশা প্রায় বিলুপ্তির পথে, ঠিক তখনই শহরের যান্ত্রিক ভিড়ে একটি ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল রিকশার দেখা মিলল। লালমনিরহাট সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ানে উঠে এসেছে এই ভিন্নধর্মী যানের পেছনের গল্প এবং বর্তমান সময়ের যান্ত্রিক ব্যস্ততার এক দারুণ চিত্র।

প্রতিবেদনে প্রকাশ পাওয়া ওই যাত্রীর বিবরণ অনুযায়ী, লালমনিরহাট শহরের অলিগলি ও রাজপথ এখন পুরোপুরি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দখলে। প্রথাগত প্যাডেল রিকশা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে দৈনন্দিন কাজে যাতায়াতের সময় হঠাৎ করেই এমন একটি রিকশার মুখোমুখি হন তারা। শুরুতে যান্ত্রিক অটোরিকশার গতির যুগে এই ধীরগতির যানে চড়ার তেমন কোনো আগ্রহ না থাকলেও বাবার অনুরোধে তাতে উঠতে বাধ্য হন ওই শিক্ষার্থী। চোখের পলকে ঝড়ের বেগে ছুটে চলা অটোরিকশাগুলো যখন তাদের রিকশাটিকে ওভারটেক করে চলে যাচ্ছিল, তখন গতির তাড়নায় তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটার উপক্রম হয়েছিল।

তবে এই যাত্রাপথেই চালকের সঙ্গে আলাপে উন্মোচিত হয় এক অন্যরকম জীবনদর্শনের গল্প। সামাজিকভাবে মিশুক স্বভাবের হওয়ায় ওই শিক্ষার্থীর বাবা সহজেই চালকের সঙ্গে আলাপ জমান। জানা যায়, ওই চালক সুদূর ২০০৩ সাল থেকে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই পেশায় যুক্ত রয়েছেন। বর্তমান যুগে সবাই যখন সহজে বেশি উপার্জনের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশায় ঝুঁকছেন, তখন তিনি কেন প্যাডেল রিকশা আঁকড়ে ধরে আছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে চালক জানান, প্রাচীন এই যানের ঐতিহ্য ও স্মৃতি মুছে যেতে দিতে চান না তিনি।

চালকের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা অত্যন্ত সাদামাটা। তিনি প্রতিদিন মোটে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় করেন এবং এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেই আর রিকশা চালান না, সোজা বাড়ি ফিরে যান। এই সীমিত আয় দিয়েই তার সংসার দিব্যি চলে যায়। এছাড়া প্যাডেল রিকশায় অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম থাকায় তিনি মূলত স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদেরই বহন করেন। যা আয় হয়, তা নিয়েই তার মনে কোনো অতৃপ্তি বা অনুযোগ নেই। সাধারণত বর্তমান সময়ে রিকশাচালকরা গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সামান্য অজুহাতে বাড়তি ভাড়ার দাবি করলেও, এই প্রবীণ চালক কোনো প্রকার অতিরিক্ত বাক্য ব্যয় না করেই সরকার বা স্থানীয় নির্ধারিত ন্যায্য ভাড়া গ্রহণ করেন। যাঁদের জরুরি তাড়া থাকে, তাঁরা এই রিকশায় চড়েন না এবং চালকও জেনেশুনে তাড়াহুড়ো করা যাত্রীদের এড়িয়ে চলেন।

বর্তমান যুগের মানুষের ব্যস্ততা ও সময়ের অভাব নিয়ে গভীর এক উপলব্ধির কথা তুলে ধরেছেন ওই শিক্ষার্থী। তিনি উল্লেখ করেন, আজকের দিনে আমরা নিজেদের অতিরিক্ত ব্যস্ত দাবি করলেও বিগত দিনের মানুষের তুলনায় আমাদের হাতে সময়ের পরিমাণ কোনো অংশে বেশি নয়। অথচ সেকালের মানুষ গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি কিংবা প্যাডেল রিকশার মতো পরিবেশবান্ধব ও ধীরগতির যানে যাতায়াত করতেন। সেই সময়ে যান্ত্রিক গতির আধিক্য না থাকায় সড়ক দুর্ঘটনার হারও ছিল অনেক কম এবং দেশের নিজস্ব ঐতিহ্যগুলোও অক্ষুণ্ণ ছিল। আধুনিকতার অন্ধ অনুকরণে আমাদের শেকড় ও ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের উচিত নিজেদের ঐতিহ্যকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা এবং তা সংরক্ষণে এগিয়ে আসা।