ডিজিটাল স্বাধীনতা কেবল প্রযুক্তিগত কোনো পছন্দের বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত রয়েছে কোনো দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা। বর্তমান বিশ্বে যে রাষ্ট্র নিজের ডেটাবেজ, অপারেটিং সিস্টেম ও ক্লাউডের নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে সমর্পণ করে রাখে, সে মূলত নিজের স্নায়ুতন্ত্র ভাড়া দিয়ে পরিচালিত হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যখন ভাড়ার শর্ত বা ভূরাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তিত হয়, তখন সেই রাষ্ট্র মারাত্মক অসহায়ত্বে পড়ে যায়। আধুনিক যুগে ডিজিটালাইজেশনের নামে রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও এর একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে বিদেশি প্রোপ্রাইটরি সফটওয়্যার কোম্পানির লাইসেন্স ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে, যার ফলে দেশীয় মেধা ও প্রযুক্তি-সক্ষমতা গড়ে উঠছে না।

গত দেড় দশকে বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার ঘটলেও এর মূল সুফল ভোগ করেছে বিদেশি প্রযুক্তি দানবরা। সরকারি খাতের বড় বড় ডিজিটাল প্রকল্পে দেখা যায়, সিংহভাগ অর্থ ব্যয় হচ্ছে ডেটাবেজ ও অপারেটিং সিস্টেমের লাইসেন্স ক্রয়ে। এমনকি স্থানীয় কোনো দেশীয় কোম্পানি সফটওয়্যার তৈরি করলেও মোট ব্যয়ের দশ ভাগের কম অর্থ তাদের ভাগে জোটে। অথচ সোর্স কোড ও সিস্টেম কনফিগারেশনের মূল নিয়ন্ত্রণ বিদেশি কোম্পানির হাতেই রয়ে যায়। বৈশ্বিক সংঘাতে টেক-জায়ান্টদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা আজ প্রতিটি দেশকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে যে, তাদের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর চাবি আসলে কার হাতে সুরক্ষিত রয়েছে।

এই বাস্তবতায় ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো মুক্ত সফটওয়্যার বা ফ্রি অ্যান্ড ওপেন সোর্স সফটওয়্যারকে (FOSS) তাদের কৌশলগত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে পরিণত করেছে। ২০১২ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জঁ-মার্ক আয়রো একটি ঐতিহাসিক সার্কুলার জারি করেছিলেন, যা ‘আয়রো মেমোরেন্ডাম’ নামে পরিচিত। এর মূল লক্ষ্য ছিল সরকারি প্রশাসনে ওপেন সোর্স প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় তথ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা। ফ্রান্সের জাতীয় পুলিশ বাহিনী প্রায় সত্তর হাজার কম্পিউটার লিনাক্সে রূপান্তর করেছে এবং সরকারি দপ্তরে লিব্রেঅফিসের মতো মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। একইভাবে ভারতের জাতীয় নীতিতে সরকারি ক্রয়ে ওপেন সোর্সকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তাদের ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ও রপ্তানি হচ্ছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সময় এসেছে। বহু বছর ধরে এ দেশের সফটওয়্যার বাজার চ্যানেল ও রিসেলারকেন্দ্রিক কমিশন-সংস্কৃতির বেড়াজালে আটকে রয়েছে। এখানে বিদেশি লাইসেন্স অতিরিক্ত মূল্যে গছিয়ে দেওয়া হয় এবং ভেন্ডার লক-ইনের খরচ চোখের আড়ালে থেকে যায়। ফলে দেশীয় মেধা ও মূলধন নিজস্ব মেধাস্বত্ব তৈরির সুযোগ পায় না। মুক্ত সফটওয়্যার মানে শূন্য খরচ নয়, বরং এর অর্থ হলো প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের প্রতিটি টাকা দেশের ভেতরেই থাকা। এর মাধ্যমে দেশীয় প্রকৌশলীদের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, স্থানীয় সেবা-অর্থনীতি চাঙ্গা হয় এবং রাষ্ট্রের নিজস্ব জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়।

রাষ্ট্রীয় সংস্কারের এই মুহূর্তে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। সরকারি ক্রয়ে ‘ওপেন সোর্স ফার্স্ট’ নীতি গ্রহণ করা, লাইসেন্স মূল্যের পরিবর্তে মালিকানার মোট ব্যয় বিবেচনা করা এবং রাষ্ট্রীয় ডেটাবেজ ও অপারেটিং সিস্টেমে ওপেন সোর্সকে ডিফল্ট মান হিসেবে ঘোষণা করা সময়ের দাবি। জনগণের অর্থে নির্মিত সফটওয়্যারের সোর্স কোডের মালিকানা রাষ্ট্রের নিজের হাতে থাকা উচিত। লাইসেন্সের দেনা পরিশোধের চেয়ে উত্তরপ্রজন্মের জন্য নিজস্ব সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা রেখে যাওয়াই একুশ শতকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।