২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে পাশ কাটিয়ে বা অবমূল্যায়ন করে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র ও সমাজ পুনর্গঠনের প্রতিটি পদক্ষেপে জুলাইয়ের চেতনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং এটি বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
শনিবার রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া) কনভেনশন সেন্টারের হেলমেট হলে ‘ফিরে দেখা জুলাই ২০২৪’ শীর্ষক এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাওয়া সদস্য, জুলাই আন্দোলনের বীর যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি মূলত জাতীয় সংহতি ও ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
অনুষ্ঠানে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কল্যাণমুখী উদ্যোগ ও ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ যেমন জাতিকে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছিল, তেমনি ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দেশে সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং একটি মানুষকেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার নতুন তাগিদ সৃষ্টি করেছে। বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকার দেশের শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিগত ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিভিন্ন ঘটনায় সশস্ত্র বাহিনীর যেসব সদস্য ও সাধারণ মানুষ আত্মত্যাগের শিকার হয়েছেন, তাদের সেই ত্যাগের ধারাবাহিকতাতেই এই জুলাই অভ্যুত্থান পরিণতি লাভ করেছে। সরকার ইতোমধ্যে গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের তিনটি ভিন্ন শ্রেণিতে মাসিক সম্মানী ভাতা প্রদান শুরু করেছে এবং গুরুতর আহতদের সুচিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়ায় উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে, যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসনের বিষয়ে তিনি জানান, সরকার একটি সুনির্দিষ্ট তথ্যভান্ডার প্রস্তুত করেছে এবং তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি, বিগত সরকারের রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে নির্যাতিত ও নিপীড়িত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের হারানো সম্মান ও মর্যাদা পুনর্বহাল করতে একটি বিশেষ বোর্ড কমিটি গঠন করা হয়েছে। মেজর সিনহা হত্যা এবং পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ব্যাপারেও সরকার আপসহীন রয়েছে বলে জানান তিনি।
সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক, প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম, সম্পূর্ণ পেশাদার এবং জনমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করে শামছুল ইসলাম বলেন, এখন থেকে বাহিনীর যেকোনো পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর সংকীর্ণ স্বার্থে সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাহিনীর মূল আনুগত্য থাকবে কেবল সংবিধান এবং রাষ্ট্রের প্রতি।
জাতীয় নিরাপত্তার সার্বিক দিক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, সাইবার সিকিউরিটি এবং জ্বালানি খাতের সুরক্ষায় বর্তমান সরকার বহুমুখী কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আধিপত্যবাদী শক্তির যেকোনো চক্রান্ত ও প্রভাব থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে ইতিহাস বিকৃতি রোধে দেশবাসীকে সবসময় সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাইয়ের ত্যাগ ও অর্জনকে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার বা অপব্যাখ্যা করার অপচেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না। অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর পুনর্বাসন ও চিকিৎসাসেবার অগ্রগতি তুলে ধরেন। এছাড়া শহীদ পরিবারের সদস্য এবং রাওয়ার অন্যান্য নেতৃবৃন্দের বক্তব্যের পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।