মধ্যপ্রাচ্যে তীব্রতর হতে থাকা সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক প্রধান নৌপথগুলোতে সরবরাহের নজিরবিহীন বিঘ্নতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতদিন ধরে বৈশ্বিক বাজারে নানা ভূরাজনৈতিক ধাক্কা সত্ত্বেও আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই ধারা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশ্বমানের আর্থিক ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থা বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম বড় পরীক্ষার মুখোমুখি এবং এই পরিস্থিতি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও নজিরবিহীন বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথ সাময়িকভাবে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। জেপি মরগানের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরের অতিসংবেদনশীল হরমুজ প্রণালিতে সামরিক চাপ ও হামলার কারণে অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল থমকে গেছে। বিকল্প উপায় হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও ক্যাপিটাল ইকোনমিকস জানিয়েছে যে সেই পথও চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। বাব আল-মানদেব প্রণালিতে অবরোধের কারণে সৌদি আরবের দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির প্রধান বাণিজ্যিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সুয়েজ খাল এড়িয়ে কিংবা আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে তেলবাহী জাহাজগুলোর চার সপ্তাহের জায়গায় প্রায় আট সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে, যা পরিবহন খরচ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নৌপথে পণ্য পরিবহনে এই অচলাবস্থার পাশাপাশি নতুন করে যুক্ত হয়েছে বিমা সংক্রান্ত আইনি জটিলতা। যুদ্ধের ঝুঁকিতে জাহাজের মাশুল ও বিমা প্রিমিয়াম আগে থেকেই ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু সামুদ্রিক বাণিজ্যের শীর্ষ বিমা সংস্থা লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (এলএমএ) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর বিমা সুবিধা পুরোপুরি বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কারণ ইরান সরকার তাদের সামুদ্রিক এলাকা ব্যবহারের জন্য ব্যারেলপ্রতি ১ থেকে ২ ডলার টোল আদায়ের প্রস্তাব করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার কারণে স্পষ্টতই বেআইনি। ফলে যেসব জাহাজ ইরানকে এই টোল দেবে, তাদের আন্তর্জাতিক বিমা কার্যকর থাকবে না। আবার টোল না দিয়ে যাতায়াতের চেষ্টা করলে হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো গভীর সংকটে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের এই প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের ফলেও এটি মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার এবং কাসপিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়ামের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন ধাক্কা লেগেছে। নিজেদের ঘরোয়া বাজারে জ্বালানির পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করতে রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়ার দৈনিক প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল ডিজেল সরবরাহ রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে পরিশোধিত তেলের সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো বৈশ্বিক কৌশলগত তেল মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। পিকারিং এনার্জি পার্টনারসের হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ মাসে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রায় ১৩০ কোটি ব্যারেল তেল খালি হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চরম মূল্যস্ফীতি ও বড় ধরনের বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্বের প্রধান তেল আমদানিকারক চীন সাময়িকভাবে নিজস্ব সঞ্চিত মজুত ব্যবহার করে বাজার সামাল দিলেও শিগগিরই তাদের আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বড় পরিসরে কেনাকাটা শুরু করতে হবে। গোল্ডম্যান স্যাকস ও আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের মতো শীর্ষ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষকদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত যদি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম খুব দ্রুত ১২০ ডলার থেকে শুরু করে ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে সব সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে।