চট্টগ্রাম বন্দরনগরীর ইপিজেড থানা এলাকায় আবারও বেহাল সড়কের বলি হলেন এক তরুণ মোটরসাইকেল চালক। ভাঙা সড়কের সুবিশাল গর্তে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়ার পর দ্রুতগামী এক কনটেইনারবাহী লরির চাকায় পিষ্ট হয়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন মো. মেহেদি হাসান (২৫) নামে এক রাইডশেয়ার চালক। শুক্রবার মধ্যরাতে নেভি হাসপাতাল গেট সংলগ্ন প্রধান সড়কে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন ও বিপজ্জনক অবস্থায় পড়ে থাকা এই সড়কের খানাখন্দই তরুণ এই চালকের অকালমৃত্যুর মূল কারণ বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

নিহত মেহেদি হাসান বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার বড় বাদুরা গ্রামের বাসিন্দা মো. হালিম শেখ ও হাওয়া বেগম দম্পতির সন্তান। জীবিকার তাগিদে তিনি বন্দরনগরীর সিঅ্যান্ডবি এলাকার একটি ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। স্ত্রী ও এক শিশুপুত্রকে নিয়ে গড়ে ওঠা তাঁর ছোট সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। রাইডশেয়ারিং অ্যাপস এবং চুক্তিতে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করে তিনি প্রতিদিনের সংসারের খরচ জোগাতেন। শুক্রবার রাতেও পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে পেশাগত দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন তিনি, কিন্তু ঘাতক সড়ক তাঁর সেই স্বপ্ন ও একটি পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ নিমিষে ধ্বংস করে দেয়।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে মেহেদি হাসান তাঁর মোটরসাইকেল নিয়ে ইপিজেড এলাকার নেভি হাসপাতাল গেট অতিক্রম করছিলেন। উক্ত সড়কটিতে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক গভীর খানাখন্দ ও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে আছে। রাতে পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং সড়কের একপাশে জমে থাকা নোংরা পানি ও ময়লার স্তূপের কারণে বিপজ্জনক গর্তটি তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়নি। মোটরসাইকেলটির সামনের চাকা গর্তে পড়ার সাথে সাথে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের ওপর আছড়ে পড়েন। ঠিক সেই মুহূর্তেই পাশ দিয়ে অতিক্রম করা একটি দ্রুতগামী কনটেইনারবাহী লরির পেছনের চাকা তাঁর মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। লরির পিষ্টতায় ঘটনাস্থলেই তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

এই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। দুর্ঘটনাকবলিত স্থানটি ঘুরে দেখা গেছে, ইপিজেড ও বন্দর সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার ভারী যানবাহন, পোশাক কারখানার শ্রমিক ও সাধারণ গণপরিবহন চলাচল করে। সত্ত্বেও নেভি হাসপাতাল গেট এলাকার সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে চরম অবহেলায় সংস্কারহীন অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। সড়কের এক পাশে প্রতিনিয়ত জমে থাকে ড্রেনের বিষাক্ত পানি, আর অন্যদিকে জমে থাকা ময়লার স্তূপ পথচারী ও চালকদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে চলেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সড়কটি মেরামতের দাবি জানানো হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যার খেসারত দিতে হলো একজন নিরপরাধ তরুণের তাজা প্রাণ দিয়ে।

ঘটনার পরপরই খবর পেয়ে ইপিজেড থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং দুর্ঘটনাকবলিত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে। বিষয়টি নিশ্চিত করে ইপিজেড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুর রহমান জানান, নৈশ টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনাকবলিত ভারী লরিটি চিহ্নিতকরণ ও এর চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। একই সাথে এ বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে নিহতের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

নগরীর ব্যস্ততম শিল্প ও বন্দর এলাকায় এমন মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কর্মী ও সচেতন মহলের মতে, চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন সংযোগ সড়কের নাজুক অবস্থা এবং নিয়মিত তদারকির অভাবে প্রতিনিয়ত এমন প্রাণহানি ঘটছে। অবিলম্বে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলোর খানাখন্দ ভরাট ও টেকসই সংস্কার নিশ্চিত করা না গেলে আগামীতে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। মেহেদি হাসানের মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি নগর ব্যবস্থাপনার উদাসীনতার এক করুণ দলিল হয়ে রইল।