টি-টোয়েন্টি বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বৈভব সূর্যবংশী যখন ক্রিজে নামেন, তখন তাঁর রুদ্ররূপ দেখে বোলারদের হাঁসফাঁস অবস্থা হয়। চার ও ছক্কার বৃষ্টিতে গ্যালারির দর্শককে উন্মাতাল করে তোলাই যেন এই তরুণ তুর্কির কাজ। তবে মাঠজুড়ে বাউন্ডারির তাণ্ডব চালানোর পর যখনই কোনো ব্যক্তিগত অর্জন কিংবা মাইলফলক স্পর্শ করেন, তখনই দেখা মেলে তাঁর সম্পূর্ণ বিপরীত এক শান্ত রূপের। মাথার হেলমেটটি সযত্নে খুলে হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে গ্লাভস পরা দুটি হাত বুকের কাছে তোলেন তিনি। এরপর দুই হাতের তর্জনী ও বুড়ো আঙুল মিলিয়ে তৈরি করেন ইংরেজি বর্ণ ‘এ’ (A)। ১৫ বছর বয়সী এই বিস্ময় বালক ক্রিকেটারের বিশেষ এই উদযাপনের পেছনের রহস্য ও গল্প জানতে দীর্ঘদিন ধরেই অনুরাগী ও ক্রীড়ামোদিদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ছিল।

এই নীরব ও নান্দনিক উদযাপনের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে গভীর এক আবেগ ও মাতৃভক্তির গল্প। বৈভব সূর্যবংশীর মায়ের নাম আরতি। শৈশব থেকেই ছেলেকে একজন সফল পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে তাঁর মায়ের ত্যাগ, অবদান ও কঠোর পরিশ্রম ছিল অতুলনীয়। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যে মা যে আত্মত্যাগ করেছেন, সেটির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শন করতেই বৈভব মাঠের ভেতরের প্রতিটি অর্জনকে মায়ের নামে উৎসর্গ করেন। নিজের হাতের আঙুলে মায়ের নামের প্রথম বর্ণটি ফুটিয়ে তুলে তিনি যেন পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দেন তাঁর এই পথচলার মূল প্রেরণা কে।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে খেলার সময় প্রথম এই উদযাপনের কারণ জানতে চাওয়া হয়েছিল সূর্যবংশীর কাছে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে চাননি তিনি। এক হাসিমুখের সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়ে ছিলেন, এটি সম্পূর্ণভাবে তাঁর একটি ব্যক্তিগত বিষয়। তবে পরবর্তীতে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির শেয়ার করা একটি আবেগঘন ভিডিওতে নিজের এই গোপনীয়তার পর্দা উন্মোচন করেন তিনি। বৈভব জানান, উদযাপনের এই ধারাটি তিনি শুধুই তাঁর মায়ের জন্য বজায় রাখছেন। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে অতিরিক্ত প্রচারণা বা বাড়াবাড়ি না করে মাঠের পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই তিনি মাকে স্মরণ করতে চান।

আইপিএল মাতিয়ে আন্তর্জাতিক আঙিনায় পা রাখার পরও বৈভবের এই অনন্য উদযাপন একটুও বদলায়নি। জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নেমেও সুযোগ পেলেই তিনি তাঁর ভালোবাসার ‘এ’ প্রতীকটি উপহার দেন দর্শকদের। সম্প্রতি হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ভারতের হয়ে টি-টুয়েন্টি ম্যাচে মাত্র ১৮ বলে এক বিধ্বংসী ফিফটি হাঁকান এই উদীয়মান তারকা। এটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর প্রথম অর্ধশতক হওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে কম বয়সে আন্তর্জাতিক ফিফটি করার বিশ্ব রেকর্ডও গড়ায় ভূমিকা রাখে। ম্যাচ জয়ের পর আবারো ভেসে ওঠে সেই পরিচিত তিন আঙুলের ‘এ’ রূপরেখা। বিশ্বমঞ্চে যতবারই বৈভবের ব্যাট হাসবে, ততবারই মাঠের বুকে মায়ের প্রতি এই অসাধারণ ভালোবাসা ও উদযাপনের দৃশ্য ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয় জয় করতে থাকবে।