টিকা গ্রহণের হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে হামের সংক্রমণ। মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ৩৫ বছরের ইতিহাসে দেশটিতে এটিই সবচেয়ে মারাত্মক হামের প্রাদুর্ভাব। মূলত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যের কারণে অভিভাবকদের মধ্যে শিশুদের টিকা দেওয়ার প্রবণতা কমে গেছে, যা এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
সিডিসির তথ্য উপাত্ত বলছে, বর্তমান বছরের শুরু থেকে দেশজুড়ে অন্তত দুই হাজার ৩১৮ জন হামে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। এই সংখ্যা বিগত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের সর্বমোট আক্রান্তের রেকর্ডকেও পেছনে ফেলেছে। এর আগে গত বছর দেশটিতে দুই হাজার ২৮৯ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং দুর্ভাগ্যবশত দুই শিশুসহ মোট তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছিল। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের সভাপতি ড. অ্যান্ড্রু রেসিন এই পরিস্থিতিকে একটি সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভবপর মানবসৃষ্ট সংকট হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এই মহামারির সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের, এবং সমাজ বা নীতিনির্ধারকদের জন্য এই পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া মানানসই নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এতে সাধারণত উচ্চ জ্বর, তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেয়। তবে সময়মতো চিকিৎসা না নিলে বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে নিউমোনিয়া এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিসের মতো মারাত্মক সব জটিলতা তৈরি হতে পারে। যা পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ক্ষতি কিংবা রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ শতকের শেষভাগে টিকাদান কর্মসূচির ব্যাপক সফলতার ফলে ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে হামমুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাবিরোধী প্রচারণা এবং জনস্বাস্থ্য নীতিমালার ওপর অনাস্থার কারণে সেই অর্জন এখন হুমকির মুখে পড়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, চলমান এই প্রাদুর্ভাব এখনই কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামী দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। সাউথ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মেলিসা নোলান আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিসংখ্যানে যা দেখা যাচ্ছে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা তার চেয়ে ঢের বেশি হবে, কারণ অনেক মৃদু সংক্রমণ শনাক্তই হচ্ছে না। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যারা সন্তানদের হামের টিকা দিচ্ছেন না, তাদের মধ্যে সাধারণ চিকিৎসা সেবার প্রতিও একধরনের অনীহা ও অনাস্থা কাজ করে।
উল্লেখ্য, করোনা মহামারী পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে টিকা গ্রহণবিরোধী মানসিকতা একধাপ বেড়েছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে হামের টিকা বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অজুহাত দেখিয়ে ছাড় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। দক্ষিণ ক্যারোলাইনার মতো অনেক অঞ্চলে এমন অসংখ্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে, যেগুলো নাগরিকদের টিকা এড়িয়ে চলার আইনি পথ বাতলে দেয়। এছাড়া বিগত বছরগুলোতে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপেও উঠে এসেছে যে, প্রতি ছয়জন মার্কিন অভিভাবকের অন্তত একজন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভীতি এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থার অভাবে সন্তানদের টিকা দিতে বিলম্ব করেন অথবা বিরত থাকেন। স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হামের এই বর্তমান প্রাদুর্ভাব কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি সামনের দিনে হুপিং কাশি কিংবা ডিপথেরিয়ার মতো অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য রোগগুলোর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির এক অশনিসংকেত।