সিনেমা বা কল্পকাহিনীর পর্দা ছাড়িয়ে বাস্তবেও অনেক সময় এমন কিছু ঘটনার অবতারণা হয়, যা সাধারণ মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের জোনসবরো শহরে এমন এক মানবিক ও চমকপ্রদ ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একটি ব্যস্ত ছয় লেনের সড়কে লাল বাতির সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ভেতর থেকে হঠাৎ নেমে আসেন জনপ্রিয় কমিক বুক চরিত্র ‘স্পাইডার–ম্যান’র পোশাকে এক তরুণ। এরপর তিনি এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে হুইলচেয়ারসহ নিরাপদে রাস্তা পার করে দেন, যা মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে।

ঘটনাটি ঘটে গত মঙ্গলবার জোনসবরো শহরের অন্যতম ব্যস্ত একটি মোড়ে। ওই সময় সড়কের সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলার কারণে গাড়ি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। এই সুযোগে এক ব্যক্তি হুইলচেয়ার চালিয়ে ছয় লেনের বিশাল সড়কটি পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ভারী যানজট এবং সিগন্যালের সীমিত সময়ের মধ্যে তার পক্ষে দ্রুত সড়ক পার হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি লাল রঙের জিপ থেকে সম্পূর্ণ স্পাইডার-ম্যানের পোশাকে এক তরুণ দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসেন।

রক্ত-মাংসের এই বাস্তব স্পাইডার-ম্যানের আসল নাম ক্রিস্টোফার হেলেনথাল, যার বয়স মাত্র ২০ বছর। ঘটনার আগের মুহূর্তে তিনি স্থানীয় একটি ট্রাম্পোলিন পার্কে আয়োজিত সুপারহিরো থিমের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শেষ করে নিজের গাড়িতে করে বাসায় ফেরার পথেই তার চোখে পড়ে অসহায় ওই হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীকে। পরিস্থিতি অনুধাবন করতে এক মুহূর্তও দেরি করেননি এই তরুণ। তিনি গাড়ি থেকে নেমেই দৌড়ে যান এবং ওই ব্যক্তিকে অভয় দিয়ে বলেন যে তিনি সাহায্য করতে প্রস্তুত। এরপর অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে হুইলচেয়ার ঠেলে নিরাপদে রাস্তার অপর প্রান্তে পৌঁছে দেন তাকে। এর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানেই সিগন্যালের বাতি সবুজ হয়ে যায় এবং সারি সারি গাড়ি চলতে শুরু করে। হেলেনথালও দ্রুত নিজের জিপে ফিরে আসেন।

পুরো বিষয়টি ধরা পড়েছিল সড়কের একটি ট্রাফিক নিরাপত্তা ক্যামেরায়। পরবর্তীতে জোনসবরো পুলিশ বিভাগ এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজটি নিজেদের অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজে প্রকাশ করে। হেলেনথালের এই মানবিক কাজের জন্য পুলিশ বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন তাকে বিশেষ ধন্যবাদ জানায়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্রিস্টোফার হেলেনথাল জানান, ব্যস্ত দুপুরের ওই সময়ে তাকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। পোশাকের কারণে কিছুটা উত্তেজনা কাজ করলেও তার মনে হয়েছিল, সুপারহিরোর পোশাকে এমন একটি কাজ করা শুধু মানবিক নয়, বেশ অর্থবহও বটে।

পুলিশের কাছে এই ঘটনাটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। জোনসবরো পুলিশ বিভাগের মুখপাত্র স্যালি স্মিথ সংবাদমাধ্যমকে জানান, তার সাত বছরের দীর্ঘ পেশাগত জীবনে তিনি এমন দৃশ্য আর কখনো দেখেননি। এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর তা হাজার হাজার নেট নাগরিকের নজর কাড়ে। ব্যবহারকারীরা তরুণের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বিভিন্ন ইতিবাচক মন্তব্য করেন। কেউ কেউ রসিকতা করে বলেছেন, বিদায় নেওয়ার আগে যদি স্পাইডার-ম্যানের সেই বিখ্যাত ভঙ্গিমাটি তিনি প্রদর্শন করতেন, তবে দৃশ্যটি আরও বেশি জমজমাট হতো। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে সুপারহিরো হওয়ার জন্য কাল্পনিক শক্তির প্রয়োজন হয় না, কেবল সদিচ্ছা আর সহানুভূতির মাধ্যমেই প্রকৃত হিরো হয়ে ওঠা সম্ভব।