প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়মে পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই তাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ডান হাত ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। মানব সভ্যতার শুরু থেকে ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলেও ডান হাত ব্যবহারের এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে প্রায় সর্বত্রই এক রকম দেখা গেছে। তবে কেন অধিকাংশ মানুষ ডানহাতি হন এবং এর পেছনে কী ধরনের জৈবিক রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নতুন একটি গবেষণায় এই বিষয়ে অত্যন্ত চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে, যা মানব বিবর্তনের ইতিহাসের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞান বিভাগের গবেষকদের মতে, মানবজাতির ডানহাত ব্যবহারের এই বিশেষ প্রবণতার পেছনে মূলত দুটি প্রধান বিবর্তনীয় কারণ দায়ী। প্রথম কারণটি হলো মানুষের দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটার অভ্যাস এবং দ্বিতীয়টি হলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্কের আকৃতির ক্রমবিকাশ ও আয়তন বৃদ্ধি। বিজ্ঞানীদের এই দলের গবেষণায় ৪১টি ভিন্ন প্রজাতির মোট ২ হাজার ২৫টি বানর ও অন্যান্য প্রাইমেট বা প্রাণীর আচরণের উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। গবেষক দল খাবার গ্রহণ, বিভিন্ন বস্তুর ব্যবহার, শরীরের শারীরিক গঠন এবং মস্তিষ্কের আকৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘পিএলওএস বায়োলজি’-তে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, মানুষের ডানহাতি হয়ে ওঠার নেপথ্যে একক কোনো কারণ নেই, বরং এটি দীর্ঘ বিবর্তনীয় পরিবর্তনের একটি সম্মিলিত ফল।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানবদেহের পা দুটি হাতের তুলনায় বেশ লম্বা এবং তা মূলত দুই পায়ে সোজা হয়ে চলার জন্য বিশেষভাবে গঠিত। যখন আদিম মানুষের পূর্বপুরুষরা চার পায়ে চলাফেরা ছেড়ে দুই পায়ে ভর দিয়ে সোজা হয়ে হাঁটতে শুরু করলেন, তখন তাদের হাত দুটি চলাচলের কঠিন দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেল। এই মুক্ত হাত দুটির মাধ্যমে মানুষ দূরদূরান্ত থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও খাদ্যসামগ্রী বহন করা শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই হাতগুলোর সাহায্যে আরও জটিল ও সূক্ষ্ম কাজ সম্পাদনের ক্ষমতা অর্জন করতে শুরু করে মানবজাতি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক থমাস এ পুশেল জানিয়েছেন, মানবজাতির ডানহাতি হওয়ার সঙ্গে জড়িত প্রধান তত্ত্বগুলো তারা প্রথমবারের মতো একটি সুসংহত গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করে দেখেছেন। তাদের প্রাপ্ত তথ্য নিশ্চিত করেছে যে, এই অভ্যাসটি সরাসরি সোজা হয়ে হাঁটা এবং বড় আকারের মস্তিষ্কের গঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ডান হাত ব্যবহারের তীব্রতা বর্তমানের মতো ছিল না। ‘আর্ডিপিতেকাস’ ও ‘অস্ট্রালোপিতেকাস’-এর মতো প্রাচীন মানব প্রজাতির জীবাশ্ম ও আচরণ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন যে, তাদের মধ্যে বড় আকারের বানরদের মতো সামান্য পরিমাণে ডান হাত ব্যবহারের লক্ষণ বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীতে মানব প্রজাতির বিবর্তনের ধাপগুলো এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা আরও বেশি স্পষ্ট হতে শুরু করে। বিশেষ করে ‘হোমো এরগ্যাস্টার’, ‘হোমো ইরেক্টাস’ এবং ‘নিয়ান্ডারথাল’ প্রজাতির মানবগোষ্ঠীর মধ্যে ডান হাত ব্যবহারের হার ক্রমান্বয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর আধুনিক মানব বা হোমো স্যাপিয়েন্সের যুগে এসে এই ডানহাতি হওয়ার প্রবণতা তার সবচেয়ে শক্তিশালী ও চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।
বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মস্তিষ্কের আয়তন ও আকৃতি যখন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, ঠিক তখনই অধিকাংশ মানুষের মধ্যে ডান হাত ব্যবহারের প্রবণতা স্থায়ী রূপ নেয়। মস্তিষ্কের আকার বড় হওয়ার সাথে সাথে এর দুটি গোলার্ধের কাজের আলাদা বিশেষায়ন বা কার্যবণ্টন ঘটে। মানুষের বাঁ মস্তিষ্ক শরীরের ডান দিক পরিচালনা করে থাকে, যার ফলে পুরো মানব জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডান হাত ব্যবহারের হার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সব প্রাচীন মানব প্রজাতি তীব্র ডানহাতি ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, ‘হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস’ নামের একটি বামনাকৃতির প্রাচীন মানব প্রজাতির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। আকারে ছোট হওয়ার কারণে এদের মধ্যে ডান হাত ব্যবহারের প্রবণতা খুব একটা জোরালো ছিল না। এই প্রজাতিটির মস্তিষ্কও ছিল আকারে বেশ ছোট এবং তারা সোজা হয়ে হাঁটার পাশাপাশি গাছে চড়তেও অভ্যস্ত ছিল।
বিজ্ঞানীদের গবেষণা এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। গবেষক দলটির পরবর্তী পরিকল্পনা হলো, মানুষের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি কীভাবে এই ডান হাত ব্যবহারের অভ্যাসকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে তা খতিয়ে দেখা। পাশাপাশি, কেন এখনও নির্দিষ্ট কিছু মানুষ জন্মগতভাবে বাঁহাতি হিসেবে রয়ে যান, সেই রহস্যেরও এখনও পুরোপুরি সুরাহা হয়নি। এমনকি টিয়া পাখি বা ক্যাঙ্গারুর মতো ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীদের মধ্যেও নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গ বেশি ব্যবহারের প্রবণতা কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়েও বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জোরালো গবেষণা চলছে।