দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার এক পুলিশ কনস্টেবল। গত শুক্রবার সকালে শহরের জনতা স্কুল রোড এলাকায় সিমেন্টবোঝাই একটি ট্রাকের চাপায় মোহাম্মদ তুহিন (১০) নামের এক স্কুলছাত্র নিহত হয়। পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে খবর পেয়ে পুলিশের টহল দলের সঙ্গে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান শিশুটির বাবা, ওই থানারই গাড়িচালক পুলিশ কনস্টেবল শামসুল হক। কিন্তু ঘাতক ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে নিথর হয়ে পড়ে থাকা শিশুটি যে তাঁরই নিজের কলিজার টুকরো সন্তান, তা তিনি শুরুতে ঘুণাক্ষরেও টের পাননি। ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিজের ছেলেকে মৃত অবস্থায় দেখতে পেয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন এই পুলিশ সদস্য।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত তুহিন কিশোরগঞ্জ শহরের গাইটাল জনতা স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। স্কুলের পাশেই একটি ভাড়া বাসায় বাবা-মা ও অন্য দুই ভাইয়ের সঙ্গে বসবাস করত সে। ভাইদের মধ্যে মেজ ছিল তুহিন। তাদের পৈতৃক নিবাস নেত্রকোনা সদর উপজেলায়। ঘটনার দিন সকালে বাসা থেকে নিজের বাইসাইকেল নিয়ে জনতা স্কুল রোড এলাকায় ঘুরতে বের হয়েছিল শিশু তুহিন। ঠিক সেই মুহূর্তেই দ্রুতগতির একটি সিমেন্টবোঝাই ট্রাক তাকে সজোরে চাপা দেয়, যার ফলে ঘটনাস্থলেই তার প্রাণহানি ঘটে।

দুর্ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে খবর পেয়ে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক ফজলে রাব্বির নেতৃত্বে পুলিশের একটি টহল দল ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সেই দলে সরকারি গাড়ির চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন শিশু তুহিনের বাবা শামসুল হক নিজেই। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সহকর্মীরা এবং শামসুল হক দেখতে পান যে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে তাঁরই আদরের সন্তান। সহকর্মী পুলিশ সদস্য ও উপস্থিত স্থানীয় জনতা এই অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। শোকে পাথর হয়ে যাওয়া বাবা শামসুল হককে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না কেউই।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল কালাম ভূঞা জানান, খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পাশাপাশি দুর্ঘটনাটি ঘটানো সিমেন্টবোঝাই ট্রাকটিকে জব্দ করা হয়েছে। তবে ঘটনার পরপরই চালক পালিয়ে যাওয়ায় তাকে আটকের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় থানায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

আইনি প্রক্রিয়া এবং ময়নাতদন্ত শেষে জুমার নামাজের পর কিশোরগঞ্জ পুলিশ লাইনস মাঠে শিশু তুহিনের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দ্বিতীয় দফা জানাজা শেষে সন্ধ্যার দিকে স্থানীয় পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো এই মেধাবী স্কুলছাত্রকে। প্রিয় সন্তানের এমন আকস্মিক ও করুণ বিদায়ে শোকে বিহ্বল পুরো পরিবার এবং এলাকাবাসী।