ভারতে সর্বভারতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর সংকটের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলন বর্তমানে এক নতুন মোড় নিয়েছে। দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা এই আন্দোলনের প্রধান মুখ ও বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক ২৬ দিনব্যাপী দীর্ঘ অনশন অবশেষে ভঙ্গ করেছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে তিনি এই অনশন প্রত্যাহার করেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে সংসদে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি উত্থাপন এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেলেও, আন্দোলনকারী সংগঠন কাকরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) তাদের মূল দাবি থেকে একচুলও সরে দাঁড়ায়নি।
অনশন ভাঙার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে এবং আন্দোলনকারী শিবিরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল যে, আন্দোলনটির গতিপ্রকৃতি নিয়ে সোনম ওয়াংচুক এবং সিজেপি নেতৃত্বের মধ্যে কি কোনো ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে? বিশেষ করে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি থেকে সিজেপি অনড় থাকায় এই জল্পনা আরও ঘনীভূত হয়। তবে সিজেপির মুখপাত্র ও শীর্ষ নেতা সৌরভ দাস ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই ধরনের সমস্ত গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওয়াংচুকের সঙ্গে সংগঠনের কোনো রকম মতপার্থক্য বা দূরত্ব তৈরি হয়নি। সিজেপির অবস্থান সম্পূর্ণ পরিষ্কার—তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে আত্মঘাতী হওয়া শিক্ষার্থীদের পরিবারপ্রতি এক কোটি রুপি ক্ষতিপূরণের দাবি থেকে কোনোভাবেই পিছু হটবে না।
দীর্ঘ এই আন্দোলনের ফলে সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটেছিল এবং অনশনকালে তাঁর প্রায় ১১ কেজি ওজন হ্রাস পায়। তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সিজেপি নেতারা জানান, ওয়াংচুক সরকারের কাছে যে চিঠি দিয়েছেন তা একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত মতামত হতে পারে, কিন্তু সংগঠন হিসেবে তারা এই আন্দোলনকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থামবে না। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকও যন্তর মন্তরের সমাবেশে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের প্রতিবাদী কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। উল্লেখ্য, এই আন্দোলনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন যে, মন্ত্রিসভা প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অপরাধ দমন করতে একটি কঠোর ও নতুন আইন প্রণয়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে।
এদিকে, আন্দোলনের মঞ্চে রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং যন্তর মন্তরে তাঁর দলের শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি নিয়ে সিজেপির পক্ষ থেকে ভারসাম্যপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছে। সংগঠনের নেতারা জানান, সংবিধানসম্মত উপায়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার সকলেরই রয়েছে এবং রাহুল গান্ধী বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। কে আন্দোলনে কৃতিত্ব পেল বা কে এল আর কে এল না, তা নিয়ে সিজেপি মাথা ঘামাচ্ছে না; তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ন্যায্য দাবি আদায় করা এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘমেয়াদি এই আন্দোলনের ধাক্কায় সিজেপির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাসহ বহু আন্দোলনকারী অসুস্থ হয়ে পড়লেও, তাদের মনোবল এখনো পুরোপুরি অটুট রয়েছে।