চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। কোম্পানিটি তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চসংখ্যক গাড়ি সরবরাহের রেকর্ড গড়েছে, যা ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের সমস্ত পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। তথ্য অনুযায়ী, এই তিন মাসে টেসলা মোট ৪ লাখ ৮০ হাজার ১২৬টি গাড়ি গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে দিয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভিজিবল আলফার মতে, বিশ্লেষকদের গড় পূর্বাভাস ছিল ৪ লাখ ২ হাজার ৭৭৬টি গাড়ির বিপরীতে টেসলার এই অর্জন বাজারকে নতুন করে আশান্বিত করেছে।
উৎপাদন ও সরবরাহের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই প্রান্তিকে টেসলা উৎপাদন করেছে ৪ লাখ ৫১ হাজার ৭৫৮টি গাড়ি। অর্থাৎ, উৎপাদনের চেয়ে ২৮ হাজারেরও বেশি গাড়ি সরবরাহ করা হয়েছে, যা কোম্পানির প্রথম প্রান্তিকে জমে থাকা মজুত বা ইনভেন্টরি কমাতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ইউরোপের বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং চীনের বাজারে মডেল ওয়াইয়ের শক্তিশালী উপস্থিতির কারণে এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। যদিও বিওয়াইডি ও অন্যান্য চীনা ব্র্যান্ডের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে টেসলাকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে, তবুও আকর্ষণীয় মূল্যছাড় এবং সহজ অর্থায়ন সুবিধার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ক্রেতাদের ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে অতীতে ভোক্তাদের মধ্যে যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ছিল, তা বর্তমানে অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে। জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং সরকারি প্রণোদনার ফলে ইউরোপের গ্রাহকরা বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে বেশি ঝুঁকছেন। মর্নিংস্টারের জ্যেষ্ঠ ইকুইটি বিশ্লেষক সেথ গোল্ডস্টেইনের মতে, ইউরোপের এই জোরালো প্রবৃদ্ধিই বর্তমানে টেসলার প্রধান চালিকাশক্তি। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রে বৈদ্যুতিক গাড়ির করছাড় সংক্রান্ত জটিলতা ও চাহিদা কিছুটা চাপের মুখে থাকলেও, নতুন মডেল ও প্রযুক্তির হালনাগাদ সংস্করণগুলো বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দিকে তাকালে দেখা যায়, টেসলা কেবল একটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। কোম্পানিটি ২০২৬ সালের মধ্যে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল মূলধনি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। এই বিপুল অর্থ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তি, সাইবারক্যাব এবং অপটিমাস রোবট তৈরির মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যয় করা হবে। ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার মূলধন নিয়ে টেসলা এখন গাড়ি ও এআই—এই দুই খাতের সমন্বয়ে বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও শেয়ারবাজারে সাময়িক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক কৌশলের ওপর ভিত্তি করে টেসলার এই অগ্রযাত্রা বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে নতুন গতি সঞ্চার করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।