পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রাজমনি ইসলামের অকাল মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও তার নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে। গত ২ জুলাই, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পাবনা শহরের ডিগ্রি বটতলা এলাকার ‘বাদশা ছাত্রী নিবাস’ নামক একটি মেস থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে সহপাঠী ও শিক্ষকদের মাঝে গভীর শোক ও স্তব্ধতা বিরাজ করছে। প্রাথমিক তদন্ত ও স্বজনদের ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিনের চরম আর্থিক অনটন এবং উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হওয়ার হতাশা থেকেই তিনি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিহত রাজমনি ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ গ্রামের বাসিন্দা আকালু ইসলামের মেয়ে। জানা যায়, রাজমনির জন্মের পর থেকেই তার বাবা একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাবার কারাবাস এবং পরিবারের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে রাজমনিকে শৈশব থেকেই চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বড় হতে হয়েছে। চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট রাজমনি অদম্য মেধায় পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। তার বড় বোন গার্মেন্টসকর্মী এবং ভাই গাড়িচালক হিসেবে কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাতেন। পরিবারের এই নুন আনতে পান্তা ফুরায় পরিস্থিতির মাঝেও রাজমনি স্বপ্ন দেখতেন বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের।

স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইইএলটিএস (IELTS) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে ও কোচিংয়ে ভর্তির জন্য প্রায় ৪০ হাজার টাকার প্রয়োজন ছিল। এই অর্থ জোগাড় করতে না পারা এবং পরিবারের আর্থিক সংকটে বড় ধরনের মানসিক চাপে ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনের এই মানসিক টানাপোড়েন তাকে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত এক অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. রাশেদুল হক এ ঘটনাকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলে মন্তব্য করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।

ঘটনার পর পাবনা সদর থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাবনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তারিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন করুণ মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নই ভঙ্গ করেনি, বরং উচ্চশিক্ষার পথে থাকা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, রাজমনির মতো শিক্ষার্থীদের জন্য এমন আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।