ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ আগ্রাসনের চার মাস আগে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনপ্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তেহরান এক অভাবনীয় ও বিশাল আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছে। দুই দেশের পাঁচটি শহর ও প্রতিবেশী ইরাকের পবিত্র স্থানগুলোজুড়ে আয়োজিত এই জানাজা কেবল শোকের অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকা এবং তাদের আদর্শিক অটুট শক্তির এক প্রদর্শনী। চরম অর্থনৈতিক সংকট ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও ইরান সরকার এই আয়োজনে কোনো কার্পণ্য করছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে তেহরান বিশ্বকে ও তাদের শত্রুদের এই বার্তা দিতে চায় যে, খামেনির মৃত্যুর পরও শাসনব্যবস্থা কেবল টিকে নেই, বরং তা আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ।
এই দাফনপ্রক্রিয়াটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যা যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের সাথে সাংঘর্ষিক। একইসাথে আরবি মহররম মাসের পবিত্রতা ও শাহাদাতের স্মারক এই অনুষ্ঠানকে আরও বেশি প্রতীকী করে তুলেছে। তেহরান, মাশহাদ, কোম এবং ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় আয়োজিত এই শোভাযাত্রাগুলোকে ইরান ‘বিজয় মিছিল’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই আয়োজনে প্রায় ৪০ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম জানাজা হিসেবে গণ্য হবে। প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিক ও ৯০০ বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি এই বিশাল ঘটনাটি কাভার করার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন।
নিরাপত্তা ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় ইরান এক নজিরবিহীন উদ্যোগ নিয়েছে। রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে লাখ লাখ মানুষকে সামলাতে ২৫০০ অ্যাম্বুলেন্স, ২১টি হেলিকপ্টার এবং ১০০টি ড্রোন মোতায়েন করা হয়েছে। বাসিজ আধা-সামরিক বাহিনী প্রায় ৫ কোটি রুটি উৎপাদনের ব্যবস্থা করেছে এবং রাজধানীজুড়ে ১৬টি ভ্রাম্যমাণ বেকারি স্থাপন করা হয়েছে। শহরের বিমানবন্দরগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে এবং শোভাযাত্রার রুটগুলোতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় কৌতূহলের বিষয় হলো, নতুন সর্বোচ্চ নেতা এবং নিহত খামেনির পুত্র মোজতবা খামেনির উপস্থিতি। ফেব্রুয়ারির হামলার পর থেকে জনসমক্ষে না আসা মোজতবা এই জানাজায় অংশ নেবেন কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর উপস্থিতি নতুন নেতৃত্বের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে, আবার অনুপস্থিতি অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ইঙ্গিত দিতে পারে। সব মিলিয়ে, এই দাফনপ্রক্রিয়া ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।