গঙ্গা ব্যারাজ বা প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই প্রকল্পের প্রতিটি কারিগরি ও পরিবেশগত সমস্যারই আধুনিক প্রকৌশলগত সমাধান রয়েছে। প্রয়োজন কেবল স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন। ১৯ বছর আগে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের নকশা নিয়ে যেমন প্রশ্ন রয়েছে, তেমনি রয়েছে এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অমূলক ভীতি।
প্রকল্পটির নামকরণ নিয়েও আন্তর্জাতিক পানি কূটনীতির জটিল সমীকরণ জড়িয়ে আছে। গঙ্গা নদীকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘গঙ্গা’ নামেই অভিহিত করা উচিত, কারণ আন্তর্জাতিক পানি সনদের আওতায় ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অধিকার আদায়ে এই নাম কূটনৈতিকভাবে সহায়ক। শুধু ‘পদ্মা’ নাম ব্যবহারের ফলে উজানের পানি প্রবাহের ওপর আমাদের দাবির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। ২০২৬ সালে গঙ্গা চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে এই নদীকেন্দ্রিক কূটনৈতিক অবস্থান সুসংহত করা এখন সময়ের দাবি।
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো পলি জমার সমস্যা এবং ভাটির অঞ্চলের পরিবেশগত বিপর্যয়। তবে জাপানের মিওয়া বাঁধের মতো আধুনিক ‘পলি বাইপাস টানেল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে পলির সমস্যার সমাধান সম্ভব। এছাড়া মাছের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য উন্নত ফিশ লক ও সঠিক পরিচালনা নির্দেশিকা থাকলে ইলিশের মাইগ্রেশনে প্রভাব পড়বে না। ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর আলোকে ড্রেজিং, স্লুইসিং এবং ফ্লাশিংয়ের সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে।
ভারতের সঙ্গে নতুন পানি চুক্তির অভাব এবং পুরোনো নকশা নিয়ে যে সমালোচনা রয়েছে, তা নিরসনে তৃতীয় পক্ষের স্বাধীন পর্যালোচনার কোনো বিকল্প নেই। ডেলফ্ট হাইড্রোলিকস বা বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পের হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিং ও পলি বাজেট পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন। ৫০ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বিনিয়োগ সুরক্ষায় কয়েক মাসের বাড়তি সময় নেওয়া অপচয় নয় বরং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। কারণ, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না করলেও বছরে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা কৃষি, মৎস্য ও সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি। পরিশেষে, ব্যারাজ হবে কি হবে না—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে বৈজ্ঞানিক ও টেকসই পদ্ধতিতে বাংলাদেশের নদীগুলোকে রক্ষা করা যায়।