বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার শিকার। সংখ্যায় এটি ৪৬ লাখেরও বেশি, যারা দীর্ঘকাল ধরে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধার মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন। বাংলাদেশের সংবিধান সর্বজনীন শিক্ষার কথা বললেও, বাস্তব চিত্রটি বেশ হতাশাজনক। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রায় ৬০ শতাংশই বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আওতার বাইরে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এই শিশুরা পরিবার ও সমাজে অবহেলার শিকার হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে, প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষায়িত বিদ্যালয়ের পরিবর্তে সাধারণ বিদ্যালয়ে মূলধারার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পাঠদান বা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা’ মডেলটি একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা সাইটসেভার্সের উদ্যোগে বাস্তবায়িত ‘শিখব সবাই’ কর্মসূচিটি এ ক্ষেত্রে একটি মডেল তৈরি করেছে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, এই কর্মসূচির আওতায় হতদরিদ্র প্রতিবন্ধী শিশুদের বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ ১৫ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া, এই শিশুদের প্রতি বুলিং বা হয়রানির হার ৮ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। গবেষণার তথ্যমতে, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ছাত্রীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ এবং বাড়িতে পড়ার সময় আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কেবল প্রতিবন্ধী শিশুদের মানসিক বিকাশে সহায়তা করে না, বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সহমর্মিতা ও সমতার বোধ তৈরি করে। তবে এই মডেলকে সফল করতে হলে কেবল নীতি নির্ধারণই যথেষ্ট নয়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান এবং অভিভাবকদের সচেতন করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র্য ও প্রতিবন্ধিতা একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত, তাই পরিবারগুলোর আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।

বর্তমানে বাংলাদেশে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষায় এবং তাদের সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসতে একটি সমন্বিত ও সামগ্রিক জাতীয় নীতিমালা প্রয়োজন। বিচ্ছিন্ন কিছু ভাতা বা উপবৃত্তি দিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, গণপরিবহন এবং কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার দাবি এখন সময়ের অন্যতম প্রধান চাহিদা।