আইন ও বিচার ব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর ঘটনার জন্ম দিয়েছে শেরপুরের একটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলা। মামলার প্রধান আসামি কান্তি মারাক কাশিমপুর কারাগারে প্রায় পাঁচ বছর আগে মারা গেলেও, তার অনুপস্থিতিতেই মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষে মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। গত বুধবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। এই ঘটনা বিচারপ্রার্থী এবং আইনি অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
মামলার নথি ও কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪৫ বছর বয়সী কান্তি মারাক মৃত্যুবরণ করেন। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাতা কেকামারি এলাকার বাসিন্দা কান্তি মারাক তিন বছর ধরে কারাবন্দি ছিলেন। ঘটনার দিন সকালে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তরও করা হয়েছিল। তবে প্রশ্ন উঠেছে, কারাবন্দি অবস্থায় আসামির মৃত্যুর বিষয়টি কেন উচ্চ আদালতের নজরে আসেনি বা কেন মামলার নথিতে তা যুক্ত হয়নি।
ঘটনার পটভূমিতে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ৩০ মার্চ শেরপুরের নালিতাবাড়ী এলাকায় একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। অনুসন্ধান চালিয়ে স্থানীয়রা প্রতিবেশী কান্তি মারাকের ঘরের মেঝেতে রক্তের দাগযুক্ত পোশাক এবং বাড়ির পাশের ড্রেন থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কান্তি মারাক আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে বিচারিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। নিয়ম অনুযায়ী, ওই রায় অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স আকারে হাইকোর্টে পাঠানো হয়।
কারাগারে বন্দির মৃত্যুর তথ্য কেন আদালতকে জানানো হলো না, এমন প্রশ্নের জবাবে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, সাধারণত কারাগারের ভেতরে কোনো বন্দির মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে চিঠি দিয়ে অবহিত করা হয়। তবে প্রায় পাঁচ বছর আগের ঘটনা হওয়ায় সে সময়ের নথিপত্র পর্যালোচনা সাপেক্ষে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া সম্ভব। বিচার বিশ্লেষকদের মতে, আইনি প্রক্রিয়ায় এমন ত্রুটি বিচার বিভাগের কার্যকারিতা ও সমন্বয়হীনতার দিকে ইঙ্গিত করে। মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার বিষয়টি আইনি ও নৈতিক উভয় দিক থেকেই এখন বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।