দেশের আমদানি বাণিজ্যে সুদের হার পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘ফরোয়ার্ড রেট এগ্রিমেন্ট’ বা ফরোয়ার্ড রেট চুক্তি চালুর অনুমোদন দিয়েছে। এই নতুন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হারের অস্থিরতা, বিশেষ করে এসওএফআর (SOFR)-এর ওঠানামা থেকে আমদানিকারকদের সুরক্ষা প্রদান করা। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ফরোয়ার্ড রেট চুক্তি মূলত এমন একটি আর্থিক ব্যবস্থা, যেখানে ভবিষ্যতের কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সুদের হার আগাম নির্ধারণ করে নেওয়া হয়। ইউজেন্স আমদানির ক্ষেত্রে, যেখানে পণ্য গ্রহণের পর একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে মূল্য পরিশোধের সুযোগ থাকে, সেখানে এই চুক্তি আমদানিকারকদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি বয়ে আনবে। বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে এসওএফআর-এর মতো মানদণ্ডভিত্তিক সুদের হারের অস্থিতিশীলতার কারণে আমদানিকারকদের ঋণের খরচ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। নতুন এই ব্যবস্থার ফলে আমদানিকারকরা একটি নির্দিষ্ট হারে ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন, যা তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও ব্যয় ব্যবস্থাপনাকে আরও সুসংহত করবে।
তবে এই সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর নীতিমালা আরোপ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই চুক্তি কেবল ঝুঁকি প্রশমনের উদ্দেশ্যে এবং প্রকৃত আমদানি লেনদেনের সাথেই যুক্ত থাকতে পারবে। কোনো ধরনের ফাটকাবাজি বা ফটকা মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি। ব্যাংকগুলোর জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়েছে, চুক্তিকৃত হার ও বাজারদরের পার্থক্যের ভিত্তিতে এই লেনদেন নিষ্পত্তি করতে হবে এবং ব্যাংকগুলোকে তাদের নিজস্ব হিসাবে কোনো ধরনের বাজারঝুঁকি বহন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এছাড়া, আর্থিক শৃঙ্খলার স্বার্থে ব্যাংকগুলোর জন্য মার্জিন সর্বোচ্চ ১০ ভিত্তি পয়েন্ট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, কোনো ব্যাংক তাদের গত ১২ মাসের গড় মাসিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের ২৫ শতাংশের বেশি পরিমাণ চুক্তি করতে পারবে না। এই সীমার মধ্যে লেনদেন সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে চুক্তিকাঠামো তৈরি, নিয়মিত বাজারমূল্যায়ন এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বজায় রাখার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে আর্থিক ডেরিভেটিভস বাজারের বিকাশে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। দীর্ঘমেয়াদে এটি আমদানিকারকদের সুদের হারের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপটি দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও আধুনিক ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে।