ইসলামের ইতিহাসের বিস্তৃত পরিসরে রাশিয়ার মুসলমানদের হজ সফরের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বাইরে থেকে গেছে। অথচ ইলিয়েন এম কেন-এর গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘রাশিয়ান হজ: এম্পায়ার অ্যান্ড দ্য পিলগ্রিমেজ টু মক্কা’ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা মুসলমানদের হজ যাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত এই বইটিতে রুশ হাজিদের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা, সমসাময়িক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং উসমানীয় ও হেজাজীয় শাসকদের সঙ্গে রুশ কূটনীতিকদের পত্রালাপের মাধ্যমে এক অজানা ইতিহাসের চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন রুশ সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলে তার সীমানা বিস্তৃত করে, তখন ইসলাম রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর আনুগত্য নিশ্চিত করা এবং তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা রুশ জারদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এই প্রেক্ষাপটে হজ সফরকে ঘিরে রুশ সরকার এক দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করে। একদিকে যেমন তারা হাজিদের যাতায়াত সহজতর করার জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন সরাইখানা নির্মাণ এবং হেজাজ রেলপথ স্থাপনে অনুদান প্রদান করেছে, অন্যদিকে এই যাত্রাকে কঠোর নজরদারির আওতায় রেখেছে। রুশ মালিকানাধীন জাহাজ ও রেল কোম্পানিগুলো এই তীর্থযাত্রার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার প্রচেষ্টাও চালিয়েছে।
গবেষক ইলিয়েন এম কেন দেখিয়েছেন যে, তৎকালীন বিশ্বে হজ ছিল অন্যতম বৃহত্তম পরিযায়ী প্রবাহ এবং রাশিয়া থেকে এটিই ছিল একক বৃহত্তম তীর্থযাত্রা। তবুও রাশিয়ার অভিবাসন ও পরিযায়ী ইতিহাসের মূলধারার বয়ানে এই হজ যাত্রার অনুপস্থিতি অত্যন্ত বিস্ময়কর। এটি মূলত রাশিয়ার ইতিহাসে মুসলমানদের অবদানের প্রতি এক ধরনের উপেক্ষারই প্রতিফলন। লেখক তাঁর এই গবেষণায় সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন যে, রুশ মুসলমানরা ছিলেন অত্যন্ত গতিশীল একটি জনগোষ্ঠী, যারা শিক্ষা, বাণিজ্য এবং ধর্মীয় প্রয়োজনে ধারাবাহিকভাবে রুশ সাম্রাজ্যের সীমানা অতিক্রম করেছেন।
২০১৫ সালে প্রকাশিত সাতটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই বইটি কেবল একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, বরং এটি ইউরেশিয়ার মুসলমানদের সক্রিয় উপস্থিতি এবং তাদের আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগের এক সমৃদ্ধ আখ্যান। মানচিত্র ও আলোকচিত্রসহ সজ্জিত এই গ্রন্থটি আধুনিক বিশ্বের পরিযায়ী ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সম্পৃক্ততাকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়। রুশ হাজিদের এই সফরনামা কেবল তাদের ব্যক্তিগত ভক্তির বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি বিশ্ব ইতিহাসের এক উপেক্ষিত অধ্যায়, যা আধুনিক গবেষকদের কাছে নতুন গবেষণার দুয়ার উন্মোচন করেছে।