নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নিঝুম দ্বীপ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য আধার। কেওড়া বন এবং সমুদ্রের মোহনায় ঘেরা এই দ্বীপটি মূলত চিত্রা হরিণের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৮ সালে বন বিভাগ কর্তৃক পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র চার জোড়া হরিণ অবমুক্ত করার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই প্রজেক্টের হরিণ সংখ্যা একসময় ৩০ থেকে ৪০ হাজারে উন্নীত হয়েছিল। ২০০১ সালে সরকার একে জাতীয় উদ্যান ও হরিণের অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। তবে বর্তমানে নানা প্রতিকূলতায় এই নিরীহ প্রাণীর অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে।
বর্তমানে চিত্রা হরিণের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন পরিবেশবিদরা। বন উজাড় ও আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে হরিণগুলো খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকটে ভুগছে। দ্বীপের চারদিকে বেড়িবাঁধের অভাব থাকায় নোনা পানি বনে প্রবেশ করে মিঠাপানির উৎসগুলোকে ধ্বংস করছে, যার ফলে হরিণগুলো তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ছে। এছাড়া, বন্যপ্রাণী শিকারিদের দৌরাত্ম্য এবং স্থানীয় কুকুরের দলের আক্রমণে প্রতি বছর অসংখ্য হরিণ প্রাণ হারাচ্ছে। বিশেষ করে পুরুষ হরিণগুলোর শিং গাছের ডালের সাথে আটকে গেলে কুকুরদের সহজ শিকারে পরিণত হয়। অন্যদিকে, বাচ্চা হরিণগুলো শিয়াল ও অন্যান্য শিকারি প্রাণীর আক্রমণে মারা যাচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে আগে পাঁচ প্রজাতির হরিণ থাকলেও হগ ডিয়ার ও সোয়াম্প ডিয়ার ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। বারকিং ডিয়ার ও সাম্বার ডিয়ারও এখন বিলুপ্তপ্রায়। চিত্রা হরিণ তুলনামূলকভাবে ভালো থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। গবেষকদের মতে, পরিকল্পিত ইকোট্যুরিজম এবং হরিণ ফার্মিংয়ের মাধ্যমে এই প্রাণীকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও হরিণ চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেতে পারে।
নিঝুম দ্বীপের এই সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বনের ভেতরে মিঠাপানির জলাধার তৈরি, বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে শিকারিদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে স্থানীয় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বনের পরিবেশ রক্ষা করাই এখন সময়ের দাবি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় যদি এই অভয়ারণ্য রক্ষায় বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করে, তবেই চিত্রা হরিণ বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং পর্যটন খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।