দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সদ্য শুরু হওয়া উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশই অংশ নিচ্ছেন না। শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দুই বছর আগে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করা প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে এবার ফরম পূরণ করেছেন মাত্র সাড়ে ৯ লাখ। ফলে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষার মূল ধারার বাইরে রয়ে গেছেন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি দেশের শিক্ষা খাতের জন্য একটি বড় ধরনের সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে এই হার ৩৩ শতাংশের কিছু বেশি হলেও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চিত্র আরও ভয়াবহ; সেখানে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৫৪ শতাংশের বেশি ফরমই পূরণ করেননি। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডেও অনুপস্থিতির হার ৪৪ শতাংশের কাছাকাছি। গত কয়েক বছরে এই হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়া নির্দেশ করে যে, শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক স্তর পার হওয়ার পরপরই বিভিন্ন কারণে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একটি প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, অনুপস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ, যা বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রকট। এছাড়াও অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র্য এবং উপযুক্ত প্রস্তুতির অভাবে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকছেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, কেবল দারিদ্র্য বা সামাজিক কুসংস্কার নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং কর্মসংস্থানের অভাবও তরুণদের পড়াশোনা থেকে বিমুখ করছে। অনেক শিক্ষার্থী এসএসসি পাসের পরপরই পরিবারের হাল ধরতে স্বল্প বেতনের চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন, যা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যদিও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা মনে করছেন, অনেকে প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে পরবর্তী বছরের জন্য অপেক্ষা করছেন, কিন্তু সামগ্রিক ঝরে পড়ার হার যেভাবে বাড়ছে, তা একটি গভীর গবেষণার দাবি রাখে।
এদিকে, দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, অনুপস্থিতির সুনির্দিষ্ট কারণগুলো চিহ্নিত করার জন্য সরকার কাজ করছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে ঝরে পড়ার হার কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। পরীক্ষা সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ করতে এবার কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যার মধ্যে কেন্দ্রে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের মতো প্রযুক্তিগত পদক্ষেপও রয়েছে। শিক্ষা উপদেষ্টাদের উপস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়েছে যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানো বা ভুয়া তথ্য প্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।