মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি এক যুগান্তকারী রায়ে ঘোষণা করেছে যে, নির্বাচন দিবসের পর দেরিতে পৌঁছানো ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট বা মেইল-ইন ব্যালটগুলোও গণনা করা যাবে। এই সিদ্ধান্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও আইনি পরাজয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে মেইল-ইন ভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন এবং একে জালিয়াতির উৎস হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে মিসিসিপি রাজ্যের একটি আইনকে বহাল রাখার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট এই বার্তা দিল যে, ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি বৈধ ভোট গণনা করা অত্যাবশ্যক।
২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকেই মেইল-ইন ব্যালট মার্কিন রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে অনেক রাজ্যেই ব্যক্তিগতভাবে ভোট দেওয়ার পরিবর্তে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন থেকেই দাবি করে আসছেন যে, মেইল-ইন ভোটিং পদ্ধতি ব্যাপক কারচুপির সুযোগ তৈরি করে এবং এটি নির্বাচনের অখণ্ডতাকে ক্ষুণ্ন করে। যদিও তার এই দাবির পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়নি, তবুও এটি তার রাজনৈতিক প্রচারণার একটি মূল বিষয় ছিল। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ট্রাম্পের সেই অবস্থানকে দুর্বল করে দিল এবং ভবিষ্যতে মেইল-ইন ব্যালট নিয়ে তার আইনি চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও কঠিন করে তুলবে।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় মূলত মিসিসিপি রাজ্যের একটি আইনের বৈধতা নিশ্চিত করেছে, যেখানে নির্বাচন দিবসের পর নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে মেইল-ইন ব্যালট গণনার অনুমতি দেওয়া হয়। এর অর্থ হলো, যদি কোনো ব্যালট নির্বাচন দিবসের মধ্যে ডাকযোগে পোস্ট করা হয়, তবে তা দেরিতে পৌঁছালেও গণনা করা যাবে। এই সিদ্ধান্ত আমেরিকানদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষত যারা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামরিক পরিষেবা বা অন্যান্য জরুরি অবস্থার কারণে ব্যক্তিগতভাবে ভোট দিতে অক্ষম। উদারপন্থী সংগঠনগুলো এবং ভোটাধিকার কর্মীরা এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন, যুক্তি দিয়ে যে এটি নিশ্চিত করবে যেন কোনো বৈধ ভোট গণনা থেকে বাদ না পড়ে।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এই রায়কে “ভয়াবহ ক্ষতি” (tremendous loss) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় ভোটার আইডি বিলের ওপর জোর দিয়েছেন, যা অনুযায়ী ভোট দেওয়ার সময় পরিচয়পত্র দেখানো বাধ্যতামূলক করা হবে। ট্রাম্প এবং তার সমর্থকরা মনে করেন যে, ভোটার আইডি আইন নির্বাচনের স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং জালিয়াতি রোধ করবে, যদিও সমালোচকরা যুক্তি দেন যে এটি নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর জন্য ভোট দেওয়া কঠিন করে তুলবে এবং ভোটারদের দমনের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় এমন এক সময়ে এল যখন ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে এবং মেইল-ইন ব্যালটের ভূমিকা আবারও আলোচনার কেন্দ্রে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই রায়ের সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্বাচনগুলোতে। এটি রাজ্যগুলোকে মেইল-ইন ব্যালট সংক্রান্ত তাদের নিজস্ব আইন পর্যালোচনা করতে উৎসাহিত করবে এবং নিশ্চিত করবে যে, ভোটারদের জন্য ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজলভ্য থাকে। যদিও এই রায় সরাসরি সমস্ত রাজ্যের মেইল-ইন ব্যালট নীতি পরিবর্তন করবে না, তবে এটি একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক বার্তা বহন করে যে, ভোটাধিকার সংরক্ষণ এবং প্রতিটি বৈধ ভোট গণনা করা মার্কিন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি মৌলিক অংশ। এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের নির্বাচন-পরবর্তী আইনি লড়াই এবং তার “চুরি হওয়া নির্বাচন” আখ্যানের ওপর আরও একটি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।