জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশি-বিদেশি সব ধরনের ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, অতীতের মতো এখনো একটি চক্র বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দাবিয়ে রাখার পায়তারা করছে এবং তারা আবার ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনের মতো ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চায়। একাত্তর, নব্বই এবং ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের মতো এবারও এসব অপশক্তির ষড়যন্ত্রের জবাব দেওয়া হবে বলে তিনি দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। একাত্তরের মতো, নব্বইয়ের মতো, ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের মতো আবারো দাঁতভাঙা জবাব আমরা দিতে চাই। সন্ধ্যায় সেখানে কনসার্টের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে নেতাকর্মীদের কাছে সমর্থন চেয়ে বলেন, আপনারা কী আমাদের সঙ্গে আছেন। এই সময়ে নেতা-কর্মী-সমর্থকরা করতালি ও স্লোগান দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানায়। হাফহাতা শার্ট ও প্যান্ট পরিহিত প্রধানমন্ত্রী নেতা-কর্মী-সমর্থকসহ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, আসুন বাংলাদেশের সকল গণতন্ত্রকামী মানুষকে নিয়ে আমরা যেকোনো ষড়যন্ত্র দেশের ভেতরেই হোক, দেশের বাইরেই হোক, সকল ষড়যন্ত্রের জবাব আমরা এক করে দেবো। তিনি বলেন, ৭ই নভেম্বর হচ্ছে, জাতীয় ঐক্যের দিন, ৭ই নভেম্বর হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে রক্ষার দিন, ৭ই নভেম্বর হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের বাক-স্বাধীনতার দিন। নিজে স্লোগান ধরে সরকারপ্রধান বলেন, আবারো আমি বলতে চাই, দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ। দেশের মানুষেরা সেই স্বৈরাচার সেই ষড়যন্ত্রকারী তাদেরকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছেন। তিনি বলেন, গ্রামীণ জনপদ নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশও নিরাপদ থাকবে।
মানিক মিয়া এভিনিউতে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে হাজার হাজার নেতাকর্মী অংশ নেন। এদিন বেলা ১২টা থেকেই ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নয়াপল্টন অভিমুখে কর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেন। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ এবং এজেডএম জাহিদ হোসেনসহ শীর্ষ নেতারা। সমাবেশস্থলে উপস্থিত লাখো জনতা করতালি ও স্লোগানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন। বিকালে র্যালিটি নয়া পল্টনের দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউতে গিয়ে শেষ হয়। পুরো রাস্তা জুড়ে র্যালিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। কাকরাইল মোড় থেকে শুরু করে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত হাজার হাজার নেতাকর্মী-সমর্থকদের সমাগমে জনসমুদ্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। তার নেতৃত্বে র্যালিটি কাকরাইল মোড়, প্রধান বিচারপতির বাস ভবনের পাশ দিয়ে রমনা পার্ক সড়ক, হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল মোড় হয়ে বাংলামোটর, ফার্মগেট, ইন্দিরা রোড সড়ক হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউতে গিয়ে শেষ হয়। র্যালির সামনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, এজেডএম জাহিদ হোসেন, আমানউল্লাহ আমান, ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি, উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর যেমন অপশক্তি পরাজিত হয়েছিল, ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে আরেকটি গণ-অভ্যুত্থানে তারা ব্যর্থ হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ইতিহাস কেবল স্মৃতিচারণ নয়, বরং এটি আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ গড়ার প্রেরণা। তিনি শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে ডিসপ্লে প্রদর্শনের প্রশংসা করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, ইতিহাস সচেতন এই প্রজন্ম দেশ গড়ার নতুন অঙ্গীকার করবে।
এদিকে, গ্রাম পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
শনিবার রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, গ্রাম পুলিশ তৃণমূলের শান্তি রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের সেবার মান বাড়াতে অবসরকালীন ভাতা ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৮০ হাজার টাকা এবং গ্রাম পুলিশ প্রধানদের ভাতা ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া যোগাযোগ খরচ বাবদ মাসে ১৫০ টাকা ও যাতায়াত ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণাও দেন তিনি। তিনি বলেন, এখন থেকে একজন গ্রাম পুলিশ সদস্য মাসিক ১০ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রাম পুলিশের প্রধান ১১ হাজার টাকা বেতন পাবেন। পাশাপাশি প্রত্যেক সদস্যকে প্রতি মাসে ১৫০ টাকা করে মোবাইল বিল দেবে সরকার। পাশাপাশি থানায় যাতায়াত ভাতাও বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে গ্রাম পুলিশ সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে ৩০০ টাকা যাতায়াত ভাতা পান।
নারীদের কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে দুইজন করে নতুন নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করা হবে। এছাড়া গ্রাম পুলিশের কাজের স্বীকৃতির অংশ হিসেবে স্থানীয় ইউনিয়নের দীর্ঘ কোনো সড়কের নাম তাদের নামে রাখার বিষয়টিও বিবেচনাধীন রয়েছে। তিনি গ্রাম পুলিশ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখা এবং বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে কোথায় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, কোথায় অপরাধের আশঙ্কা রয়েছে- এসব বিষয়ে গ্রাম পুলিশ আগেভাগে তথ্য সংগ্রহ করে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে পারে।
ঢাকা সেনানিবাসের আর্মি স্টেডিয়ামে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও ক্যাডেটদের আয়োজিত অনুষ্ঠানেও প্রধানমন্ত্রী ৭ই নভেম্বরকে স্বাধীন বাংলাদেশের ‘ম্যাগনাকার্টা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ধর্মীয় পরিচয় বা নৃ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার পরিচয় একটাই—আমরা বাংলাদেশি। এই পরিচয়েই জাতি ঐক্যবদ্ধ। ভবিষ্যতে কেউ যাতে দেশের মানুষের অধিকার হরণ করতে না পারে এবং বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানটিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামছুল ইসলামসহ তিন বাহিনীর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। পুরো আয়োজনে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার শাসনামল এবং ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ঘটনাগুলো তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা। নেতাকর্মীদের হাতে বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আলোকচিত্র সম্বলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। এর আগে সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বেলা পৌনে ১২টার দিকে তেজগাঁওয়ে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে যোগ দেন তিনি।