জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন সংকোচন, বাজেট হ্রাস ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে শান্তিরক্ষী কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষ করে ‘নিউইয়র্ক বাংলা লাইফ’ নামক ইউটিউব চ্যানেলে শেখ হাসিনার কথিত ভিডিও ও অডিও বার্তা প্রকাশ করা হয়। সেখানে সেনাসদস্যদের উসকানি দেওয়ার পাশাপাশি প্রতি ফোটা রক্তের হিসাব নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সহস্রাধিক মৃত্যুর রাজনৈতিক দায় এড়াতে এবং প্রবাসীদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরিতেই এসব বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তব তথ্য বিশ্লেষণ করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সশস্ত্র বাহিনীর শক্তিশালী অবস্থানের চিত্রই ফুটে ওঠে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং সেনাবাহিনীকে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য দেশের বর্তমান স্থিতিশীলতা বিনষ্টের অপচেষ্টা হতে পারে।
বাস্তবতা হলো, ২০১৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের প্রধান অর্থায়নকারী দেশগুলোর নীতিগত রদবদল, অনিশ্চয়তা ও বকেয়া বকেয়া অর্থ না পাওয়ার কারণে বাজেট সংকুচিত হয়েছে। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেট ১০ শতাংশের বেশি কমিয়ে ৫.১ বিলিয়ন ডলারে নামানো হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ শান্তিরক্ষী হ্রাস করা হয়েছে। এই সংকটের কারণে মালির মিশন বন্ধের পর গত ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে পশ্চিম সাহারায় ৩৫ বছর ধরে চলা মিশনও বন্ধ করা হয়। অতএব, সদস্য কমাকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কমার প্রমাণ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এই আর্থিক সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী সদস্যসংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
জাতিসংঘের বৈশ্বিক মিশন সংকোচনের মাঝেও শান্তিরক্ষী প্রেরণে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত প্রথম থেকে চতুর্থ অবস্থানের মধ্যে রয়েছে। তাছাড়া জাতিসংঘের নিয়মিত মিশনের বাইরেও বিভিন্ন দেশে দ্বিপাক্ষিক ও হাইব্রিড কার্যক্রমে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ৩,৪০০-এর বেশি সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। এর মধ্যে অপারেশন কুয়েত পুনর্গঠনে (ওকেপি) বর্তমানে ৫,৭৬৮ জন সদস্য কাজ করছেন। অন্যদিকে গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোর্সের (জিএসএফ) আওতায় ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে হাইতিতে ১,৪০০ সদস্য পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে, যার মধ্যে ২৩০০ সদস্যের একটি অগ্রগামী দল ইতোমধ্যে পৌঁছাবে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য দুটি উদ্যোগ হলো— অপারেশন কুয়েত পুনর্গঠন (ওকেপি): কুয়েতে পরিচালিত এই কার্যক্রমে মোট ৫ হাজার ৭৬৮ জন সদস্য রয়েছেন। এরই মধ্যে ২৩০ সদস্যের একটি অগ্রগামী দল হাইতিতে অবস্থান করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতার পরিধি দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, কাতারে কর্মরত বাংলাদেশ মিলিটারি কন্টিনজেন্টের (বিএমসি) সদস্য সংখ্যা বেড়ে ৫,৭৬৭ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন কোস্ট অ্যান্ড বর্ডার সিকিউরিটিতে বর্তমানে ১৩৭ জন নৌবাহিনীর সদস্য কর্মরত আছেন এবং আগামী ৫ নভেম্বর আরও ২৪ জন যুক্ত হয়ে এ সংখ্যা দাঁড়াবে ১৬১ জনে। এ ছাড়া কাতার সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন পদে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর আরও ৫০০ জন সদস্যের নিয়োগ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যারা আগামী চার-পাঁচ মাসের মধ্যে সেখানে যোগ দেবেন।
একইভাবে সৌদি আরবে দুটি ফ্রিগেট এবং একটি এয়ার ডিফেন্স (এডি) ব্যাটারিসহ নতুন করে ১,০০০ সামরিক সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই পদক্ষেপর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের সামরিক উপস্থিতি ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সুগম হবে। আনুপাতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক।
সুতরাং, জাতিসংঘের মিশন সংকোচনের বৈশ্বিক বাস্তবতাকে এড়িয়ে শান্তিরক্ষী কমার দোহাই দিয়ে বাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ভিত্তিহীন। কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবে সামরিক সহযোগিতার এই বিস্তার প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা আগের মতোই অক্ষুণ্ণ রয়েছে। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সংকটে পড়েছে—এমন দাবির সঙ্গে উল্লিখিত তথ্য-উপাত্তের সামঞ্জস্য পাওয়া যায় না।