মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে গাম্বিয়ার করা ঐতিহাসিক মামলার রায় আগামী ১৯ নভেম্বর ঘোষণা করা হবে। নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) পিস প্যালেসে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় এই প্রকাশ্য অধিবেশন শুরু হবে। আদালতের প্রেসিডেন্ট বিচারক ইওয়াসাওয়া ইউজি রায়টি আনুষ্ঠানিকভাবে পড়ে শোনাবেন বলে মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করেছে আইসিজে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইসিজে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। গাম্বিয়ার আবেদনের সঙ্গে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনও ছিল।

জাতিসংঘের সর্বোচ্চ এই আদালতে ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর গাম্বিয়া এই মামলা দায়ের করে। দেশটির অভিযোগ, ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান ছিল মূলত পরিকল্পিত গণহত্যা। ওই দমন-পীড়নের মুখে অন্তত সাত লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে অবস্থান করছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাম্বিয়া ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর আইসিজেতে মামলাটি করে। এরপর মিয়ানমার তাদের জবাবি লিখিত বক্তব্য জমা দেয়। গাম্বিয়া ও মিয়ানমার পর্যায়ক্রমে নিজেদের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জবানবন্দিতে মিয়ানমার বাহিনীর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ এবং বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশনও এই অভিযানকে ‘গণহত্যামূলক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তবে মিয়ানমার বরাবরই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং ওই অভিযানকে সন্ত্রাসবিরোধী বৈধ কার্যক্রম বলে দাবি করছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওই অভিযানে কতটা ব্যাপক মাত্রায় হত্যা, ধর্ষণ ও জ্বালাও-পোড়াও চালিয়েছে, তার ভয়াবহ বিবরণ এসেছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কথায়।

মামলাটিতে গাম্বিয়া আদালতের কাছে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার চেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গণহত্যা সনদের লঙ্ঘনকারী মিয়ানমারকে দোষী সাব্যস্ত করা, সব ধরনের সহিংসতা বন্ধের নির্দেশ এবং ভুক্তভোগী রোহিঙ্গাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ আর না ঘটানোর নিশ্চয়তাও চাওয়া হয়েছে।

আদালতের এখতিয়ার নিয়ে গাম্বিয়া ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের নবম অনুচ্ছেদের যুক্তি তুলে ধরেছে। ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি আদালত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ২২ জুলাই এক রায়ে আদালত জানায়, মামলাটি শুনানির জন্য তাদের পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে এবং গাম্বিয়ার আবেদন গ্রহণযোগ্য। পাশাপাশি মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রমাণ সংরক্ষণ এবং এ বিষয়ে নেওয়া পদক্ষেপের প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

বর্তমানে এ মামলায় কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, মালদ্বীপ, স্লোভেনিয়া, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, বেলজিয়াম এবং আয়ারল্যান্ডসহ মোট ১১টি দেশ পক্ষভুক্ত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণ করা অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া। অভিযোগকারীকে শুধুমাত্র নিপীড়নের তথ্য দিলেই হয় না, বরং অভিযুক্ত কোনো জাতীয়, নৃতাত্ত্বিক, ধর্ম বা বর্ণগত গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট ‘অভিপ্রায়’ (Intent) ছিল, সেটিও প্রমাণ করতে হয়। ১৯৪৮ সালের সনদে এই অভিপ্রায়কে গণহত্যার অন্যতম মৌলিক উপাদান হিসেবে রাখা হয়েছে। কারণ, কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হত্যা বা নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে—এমনটি প্রমাণ করাই যথেষ্ট নয়।

আইসিজে মূলত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব পালন করে। তবে মনে রাখা জরুরি, এই আদালত কোনো ব্যক্তির ফৌজদারি বিচার করে না, বরং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করে। আইসিজে-এর রায় চূড়ান্ত বলে গণ্য হয় এবং এর বিরুদ্ধে কোনো আপিলের সুযোগ নেই। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সনদ বাস্তবায়ন বা ব্যাখ্যা নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর বিরোধ আইসিজেতে তোলা যায়।

বাংলাদেশের জন্য এই মামলার রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে, কিন্তু তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায়ের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের আন্তর্জাতিক বিচারিক মূল্যায়ন সম্পন্ন হবে এবং মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা নতুনভাবে নির্ধারিত হতে পারে।