যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল কংগ্রেসের আসন হারালে তাঁর নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা সীমিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সম্ভাব্য ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নতুন কোনো সুযোগ বয়ে আনবে কি না, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে জোর আলোচনা চলছে। মূলত ইরান যুদ্ধের প্রভাব ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতবদল হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা কৌশলে বড় কোনো আমূল পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। তবে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ কমলেও ট্রাম্পের নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে—এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। এমনকি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অভিশংসনের উদ্যোগও দেখা যেতে পারে। সেই ভেটো অকার্যকর করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ওই শুল্ক বাতিল করেন। সম্প্রতি এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধে শক্তিশালী রায় এলে রিপাবলিকান পার্টির মুক্তবাণিজ্যপন্থী অংশ আরো সক্রিয় হতে পারে। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সময় এই অংশের অনেকেই চাপের মুখে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে গিয়েছিলেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টার প্রসঙ্গ টেনে তিনি এ কথা বলেন।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এপ্যাক অ্যাডভাইজার্সের প্রধান নির্বাহী স্টিভেন ওকুন মনে করেন, পুরো এশিয়া অঞ্চল অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বিষয়টিকে একধরনের ‘রাজনৈতিক নাটকীয়তা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস গেলেও ইরান যুদ্ধ নিয়ে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। যদিও এ অঞ্চলের জনমত যুদ্ধের বিপক্ষে, তবুও এটি বন্ধে ট্রাম্পকে বাধ্য করা কংগ্রেসের পক্ষে কঠিন হবে। তার ভাষায়, কংগ্রেস শুল্কনীতি বদলাতে পারবে না। গিল্ডের মতে, কংগ্রেসের প্রচলিত তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রাম্পকে কার্যকরভাবে বিরোধিতা করা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে ডেমোক্র্যাটদের অতীত রেকর্ড ভালো নয়।
ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সংকটে এশিয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফিলিপাইন তাদের অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। জানুয়ারিতে সংঘাত শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর যে তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হতো, তার বড় অংশই এ অঞ্চলের দেশগুলো আমদানি করত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে এসব দেশ জ্বালানিসংকটে পড়ে।
জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় গত মার্চ থেকে দেশটিতে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা চলছে।
সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের তথ্যমতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে এ অঞ্চলের দেশগুলো বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের (আইএসইএএস)-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার ও পূর্ব তিমুরের মতো অঞ্চলের দরিদ্র অর্থনীতিগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমেছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে, তবুও ট্রাম্প ইরানে হামলাকে আত্মরক্ষামূলক বলে চালিয়ে যাচ্ছেন এবং কংগ্রেসের নির্দেশ উপেক্ষা করার নজির সৃষ্টি করেছেন। এরপর বিকল্প পথে এগোয় ট্রাম্প প্রশাসন।
বাণিজ্য ও শুল্কনীতির ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। গত বছর বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ট্রাম্প প্রায় ৯০টি দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন। এর ফলে কম্বোডিয়া (৪৯%), লাওস (৪৮%), ভিয়েতনাম (৪৬%) এবং মিয়ানমারের (৪৫%) মতো দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি গত জুলাইয়ে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ তুলে ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। অন্যদিকে ভোক্তাদের ওপর জ্বালানির বাড়তি দামের চাপ কমাতে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম সরকার বিপুল অর্থ ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় করেছে। গত বছর তীব্র ও ব্যয়বহুল বাণিজ্যযুদ্ধের পর দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা উষ্ণতা এসেছে।
বিশ্লেষক স্টিফেন ওলসনের মতে, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে শক্তিশালী হলে তারা হয়তো রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ শুল্ক ছাড়ের পক্ষে চাপ দিতে পারে, যা এ অঞ্চলের জন্য সামান্য আশার আলো হতে পারে। তবে বড় ধরনের বাণিজ্যিক পরিবর্তনের জন্য ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
নিরাপত্তা বিষয়ে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ ফেলো জশুয়া কুরলানজিক জানান, এশিয়ার দেশগুলো ওয়াশিংটনের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায়। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আধিপত্য ও আঞ্চলিক পাঁচটি দেশের সঙ্গে বেইজিংয়ের বিরোধের প্রেক্ষাপটে এশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের আরও দৃশ্যমান উপস্থিতি প্রত্যাশা করে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ দাবি করলেও, ট্রাম্প বাণিজ্য সমঝোতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তাইওয়ানের কাছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব এখনো আটকে রেখেছেন।
প্রযুক্তি খাতেও কড়াকড়ি আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্টিভেন ওকুন জানান, ‘রিমোট অ্যাকসেস সিকিউরিটি অ্যাক্ট’, ‘চিপ সিকিউরিটি অ্যাক্ট’ এবং ‘ম্যাচ অ্যাক্ট’-এর মতো কঠোর আইন নিয়ে দুই দলের মধ্যেই ঐকমত্য রয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, পরবর্তী কংগ্রেস এসব আইন পাস করবে। এর মাধ্যমে চীনের উন্নত প্রযুক্তি ও চিপ তৈরির সক্ষমতা সীমাবদ্ধ করার প্রক্রিয়া আরও বেগবান হবে। এশিয়ার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও নির্বাচনের ফলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য, সফটওয়্যার বা প্রযুক্তিতে দূর থেকে প্রবেশের ক্ষেত্রেও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হবে। ‘চিপ সিকিউরিটি অ্যাক্ট’-এর আওতায় উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চিপ অনুমোদিত স্থানে রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এ ছাড়া ‘মাল্টিল্যাটারাল অ্যালাইনমেন্ট অব টেকনোলজি কন্ট্রোলস অন হার্ডওয়্যার অ্যাক্ট’ বা ‘ম্যাচ অ্যাক্ট’ রয়েছে।
পরিশেষে, ইন্দোনেশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেমস গিল্ডের মতে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। রিপাবলিকানরা আসন হারালে ট্রাম্প দেশের ভেতরে চাপে পড়ে পররাষ্ট্রনীতিতে আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে।