বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি নিয়ে একটি বিশদ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এই গবেষণায় উঠে এসেছে যে, দেশের অন্তত ১০টি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব পরিবারকেন্দ্রিক। এছাড়া অধিকাংশ দলের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একক ব্যক্তির মতামতের প্রাধান্য স্পষ্ট। নেতৃত্ব নির্বাচনে সাংগঠনিক দক্ষতার চেয়ে পরিবার, আর্থিক সক্ষমতা এবং তারকাখ্যাতিকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি জানায়, গবেষণার জন্য ৪২টি দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ৩২টি দল থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। এতে ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাগপা ও বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টির নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি শেখ হাসিনা সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় নেতৃত্বে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ১২টি দলের প্রধান অন্তত এক দশক ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ছাড়া আর কোনো দলের গঠনতন্ত্রে দলীয় প্রধানের মেয়াদসীমা সুনির্দিষ্ট করা নেই। ১২টি দলের প্রধান অন্তত ১০ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন।

সাংগঠনিক কাঠামোয় স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে টিআইবি জানিয়েছে, গঠনতন্ত্রে জাতীয় কাউন্সিল বা সম্মেলনের কথা থাকলেও ১৬টি দল নিয়মিতভাবে তা আয়োজন করে না। অনেক সময় কাউন্সিলে আগে থেকেই নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। নেতৃত্ব নির্বাচনে গোপন ব্যালটের বদলে কণ্ঠভোটের চর্চা বেশি। টিআইবির মতে, কেবল সিপিবি ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিতে শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেখা গেছে। এছাড়া স্থানীয় কমিটির প্রস্তাব উপেক্ষা করে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও দলীয় প্রধানের একচ্ছত্র প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বড় দলগুলোর বিরুদ্ধে মনোনয়ন-বাণিজ্য, অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাবের অভিযোগও উঠে এসেছে গবেষণায়।

নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও দলগুলোর চিত্র হতাশাজনক। মাত্র দুটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্যের হার ৩৩ শতাংশ বা তার বেশি। জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্যই নেই। পাশাপাশি নেতা-কর্মীদের আচরণবিধি, নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ তদন্তের জন্য কোনো কার্যকর আপিল প্রক্রিয়া নেই। আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও দলগুলোর বার্ষিক বাজেট ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

রাজনৈতিক সহিংসতাকেও গবেষণায় বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪ হাজার ২৮০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় মোট ৭৪৬ জন নিহত হয়েছেন এবং ৪৬ হাজার ৩৫১ জন আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে টিআইবি। এই পরিস্থিতি উত্তরণে দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনা, নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন, গোপন ব্যালটে নেতৃত্ব নির্বাচন, নেতৃত্বের মেয়াদ নির্ধারণ এবং তৃণমূলের ভোটে প্রার্থী প্যানেল তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং অপরাধী নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে টিআইবি। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক।