কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে মাটির গভীর থেকে নির্গত গ্যাসের আগুন টানা পাঁচ দিন ধরে জ্বলছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গ্যাসের পাশাপাশি সেখানে তেল বা কনডেনসেট থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং মাটির নিচের গ্যাসের প্রকৃত উৎস ও মজুতের পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলা ১৫ দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে ‘রিলিফ কূপ’ খননের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কাও। দেশে সাধারণত ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যানবাহন নিয়ে চলাচলেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার একটি উচ্চ পর্যায়ের কারিগরি দল জানিয়েছে, মাটির অগভীর স্তরে কোনো গ্যাসের মজুত বা ‘শ্যালো রিজার্ভার’ থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন। ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত নমুনাসমূহ পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যদি এখান থেকে বাণিজ্যিক ও ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি আহরণ সম্ভব হয়, তবে এটি হবে দেশের ৩১তম খনিজ কূপ।
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির জানিয়েছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তবে নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী শোয়েব জানান, গত বৃহস্পতিবার পেট্রোবাংলায় আয়োজিত এক সভায় অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক এবং বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা আগুনের ধরন বিশ্লেষণ করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, নির্গত গ্যাসটি থার্মোজেনিক ও বায়োজেনিক প্রকৃতির হতে পারে, আর শিখার রঙ থেকে তেল থাকার বিষয়টিও অনুমান করা হচ্ছে। কারণ, যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
প্রকৌশলী শোয়েব আরও জানান, আগামী ১৫ দিন ধারাবাহিকভাবে আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাস নির্গমনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হবে। যদি দেখা যায় আগুনের তীব্রতা কমছে না বা বেড়েই চলেছে, তবে ‘সাইড ট্র্যাকিং’ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রিলিফ কূপ খনন করে গ্যাস প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা চালানো হবে। এছাড়া বাপেক্স সেখানে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মজুতের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।
গত ২৭ অক্টোবর সকালে ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় একটি বাড়িতে নলকূপ স্থাপনের সময় মাটির প্রায় এক হাজার ফুট নিচে পাইপ পৌঁছালে হঠাৎ গ্যাস বের হতে শুরু করে এবং তাতে আগুন ধরে যায়। ঘটনার পর প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় এলাকাটিকে বিভিন্ন নিরাপত্তা অঞ্চলে ভাগ করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মো. শোয়েবের মতে, আশপাশের কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকেও গ্যাস জ্বলতে দেখা গেছে। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জননিরাপত্তার স্বার্থে উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করেছেন। এই আদেশের আওতায় ওই এলাকায় আগুন জ্বালানো, ধূমপান করা বা দিয়াশলাই ও লাইটার জাতীয় কোনো দাহ্য বস্তুর ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং এবং কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে এলাকাটি ঘিরে রাখলেও উৎসুক মানুষের ভিড় থামানো যাচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দা ছৈয়দ আলম জানান, বাপেক্স শুরুতে ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা দেওয়ায় এলাকাবাসী ভেবেছিল আগুন দ্রুত নিভে যাবে, কিন্তু এখন আতঙ্ক বাড়ছে। আরেক বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, আগুনের কারণে রাস্তার উভয় পাশে চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। শহিদুল আলম নামে অপর এক স্থানীয় ব্যক্তির অভিযোগ, ঘটনার তিন দিন পর ১৪৪ ধারা জারি করা হলেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লোকজন ভিড় করছেন, যা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এদিকে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে এলাকায় মাইকিংয়ের পাশাপাশি বসানো হয়েছে কাঁটাতারের বেড়া ও লাল পতাকা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ১৪৪ ধারা জারির পরও প্রতিদিনই বিকালে ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড় বেড়ে যাচ্ছে। এদিকে আগুনের এমন পরিস্থিতিতে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।