শোকেসের কাচের দরজার ওপাশে সারি সারি সাজানো থাকে ফুল আঁকা প্লেট, সোনালি পাড়ের বাটি কিংবা বাহারি কাপ-পিরিচ। এর কিছু হয়তো বিয়েতে পাওয়া উপহার, আবার কিছু বিদেশ থেকে আনা শৌখিন সামগ্রী। কিন্তু সুন্দর এসব বাসনের অনেকগুলোই বছরের পর বছর শোকেসের ভেতরেই বন্দি থাকে। কারণ, এগুলো ‘মেহমান বা বিশেষ দিনের’ জন্য তুলে রাখা হয়েছে। প্রতিশ্রুতির পরও থামছে না ‘মব’ সহিংসতায় মৃত্যু। কিন্তু এ বিষয়ে বাংলাদেশে কোনো গবেষণা এখন পর্যন্ত হয়নি। শরিফ দেখিয়েছেন, মানুষ কিছু বিশেষ বা আনন্দদায়ক জিনিস বিশেষ উপলক্ষের জন্য তুলে রাখতে চায়। শেষ পর্যন্ত সেটা দীর্ঘদিন অব্যবহৃতই থেকে যায়। ফলে ভালো জিনিস বাঁচিয়ে রাখতে হবে, এই শিক্ষা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে আসা অস্বাভাবিক নয়। ভালো খাবারের অংশটি হয়তো আগে দিয়েছেন সন্তানদের।

রাজধানীর ইস্কাটন এলাকায় থাকেন বেসরকারি চাকরিজীবী নাফিয়া জাহান মুন্নি (৩৬)। তিনি তার মায়ের কাছ থেকে এই অভ্যাসটি দেখে এসেছেন। মুন্নি বলেন, তার মা মেহমান না এলে কখনোই ভালো প্লেট-গ্লাস বের করতেন না। অথচ তার বাবা দুবাই থেকে অনেক সুন্দর বাসনকোসন নিয়ে আসতেন। ছোটবেলায় বিষয়টি মুন্নির ভালো লাগত না, কারণ পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি নিজেকে মেহমানের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন না। তবে এখন তিনি নিজের ঘরে আলাদা রীতি অনুসরণ করেন। মুন্নি জানান, তিনি মেহমানদের জন্য যেমন সুন্দর বাসন বের করেন, নিজের পরিবারের ব্যবহারের জন্যও তেমনটি করেন। আমরা সেগুলোতে খেতে চাইলে মা দিতেন না।’।

মানুষের এই আচরণের পেছনে মনোবিজ্ঞান ও সামাজিক কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এর সঙ্গে মিশে আছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক অভ্যাস। তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ার বাসিন্দা তাসলিমা আক্তার এখনো তার শোকেসে সুন্দর বাসনপত্র সাজিয়ে রেখেছেন, যা কেবল মেহমান এলেই ব্যবহারের সুযোগ হয়। তার কিশোরী মেয়ে মৌমিতা তাসনিম পারি মাঝেমধ্যে সেগুলো ব্যবহারের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তাসলিমা তা নিরুৎসাহিত করেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এগুলো দামি জিনিস, নিয়মিত ব্যবহার করলে ভেঙে যেতে পারে বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মনোবিজ্ঞানের কয়েকজন শিক্ষককে এমন আচরণের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, বিষয়টা তাদেরও ভাবিয়েছে। সেটা ভেঙে গেলে বা নষ্ট হলে সহজে আরেকটা কেনার সুযোগ নাও থাকতে পারে। খাবার শুধু পেট ভরানোর বিষয় নয়, মানুষ খাবার ও খাওয়ার আয়োজনের মধ্য দিয়ে পরিচয়, রুচি এবং সামাজিক অবস্থানও প্রকাশ করে। বিষয়টা কতটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো থেকে চাপিয়ে দেওয়া আর কতটা স্বতঃস্ফূর্ত তা নিয়ে আলোচনা থাকতে পারে।

সাবেকুন নাহার সাদিয়ার মা নূরজাহান বেগমও একইভাবে ভালো বাসনপত্র আলাদা করে রাখেন। তার মতে, প্রতিদিন ব্যবহারের জন্য সাধারণ জিনিস হাতের কাছেই থাকে, কিন্তু মেহমান রোজ আসে না। তাদের আপ্যায়নে ভালো জিনিস ব্যবহার করাই নিয়ম। এছাড়া ভেঙে যাওয়ার ভয়েও তিনি প্রতিদিন দামি কাচের বাসন ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সুপর্ণ দাশের মা সীতা রানী দাশও (৫০) একই মত পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, প্রতিদিন ব্যবহারের জন্য সাধারণ প্লেটই উপযুক্ত, কারণ সুন্দর জিনিস প্রতিদিন ব্যবহার করলে তা পুরোনো হয়ে যায় বা দাগ পড়ে যেতে পারে।

তবে ভিন্ন মত প্রকাশ করেন বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক আইরিন আহমেদ (২৭)। তিনি মনে করেন, কোনো বিশেষ দিনের অপেক্ষায় সুন্দর জিনিস আটকে রাখা উচিত নয়। তার মতে, ভালো প্লেট বা গ্লাসে খাবার খেলে মন ভালো থাকে, যা দৈনন্দিন জীবনে ঈদের আমেজ তৈরি করতে পারে। সাধারণ ভর্তা-ভাতও সুন্দর পাত্রে পরিবেশন করলে তা তৃপ্তি বাড়িয়ে দেয়। কেবল বাসনপত্র নয়, দামি শাড়ি, জুতা কিংবা বিছানার চাদরের ক্ষেত্রেও অনেকে এমন আচরণ করেন। মাহফুজ আনামের কলাম / কেবলমাত্র নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে। আমাদের মা-খালা, ফুফু, নানি-দাদিদের অনেকের ঘরেই ছিল এমন শোকেস। আগের প্রজন্মের অনেকের জীবন আজকের তুলনায় কম ভোগ্যপণ্যনির্ভর ছিল।

ভোক্তা মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ যখন কোনো জিনিসকে বেশি মূল্যবান বা বিশেষ মনে করে, তখনই তা ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়। ২০১৮ সালে ‘জার্নাল অব মার্কেটিং বিহেভিয়ার’-এ প্রকাশিত ‘অকেশন ম্যাচিং অব ইনডালজেন্সেস’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ অনেক সময় ভালো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিশেষ জিনিসের ব্যবহার আরও পরে করার জন্য জমিয়ে রাখে।

এই আচরণের পেছনে ‘স্কারসিটি মাইন্ডসেট’ বা অভাবের মানসিকতাও একটি বড় কারণ।

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেন্ধিল মুল্লাইনাথান ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী এলদার শাফির তাদের ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘স্কারসিটি: হোয়াই হ্যাভিং টু লিটল মিনস সো মাচ’ বইয়ে এই ধারণাটি ব্যাখ্যা করেছেন। সেখানে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লস অ্যাঞ্জেলেস ক্যাম্পাসের অধ্যাপক সুজান বি। এই তত্ত্বকে পরবর্তী গবেষণাগুলোও বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেছে।

২০১৯ সালে ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত গবেষণায়ও দেখা যায়, অভাবের অভিজ্ঞতা একজন ভোক্তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। ‘এ স্কারসিটি মাইন্ডসেট অলটার্স নিউরাল প্রসেসিং আন্ডারলাইং কনজিউমার ডিসিশন মেকিং’ নামে ওই গবেষণায় দেখা যায়, স্কারসিটি মাইন্ডসেট ভোক্তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের কিছু প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের নিম্ন-মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোতে আর্থিক বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের পরিকল্পনার কারণেই মূলত এমন অভ্যাস গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মতো সমাজে পরিবারের যত্ন নেওয়া, রান্না করা ও অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্ব যুগের পর যুগ ধরে নারীদের ওপর পড়েছে।

এছাড়া ১৮৯৯ সালে থর্স্টেইন ভেবলেন তার ‘দ্য থিওরি অব দ্য লেজার ক্লাস’ গ্রন্থে ‘কনস্পিকুয়াস কনজাম্পশন’ বা প্রদর্শনমূলক ভোগের ধারণা দেন। ২০২২ সালে ‘জার্নাল অব রিটেইলিং’-এ প্রকাশিত পর্যালোচনাভিত্তিক গবেষণায় দেখা যায়, সামাজিক মর্যাদা প্রকাশের জন্য অনেক সময় দামি জিনিস ব্যবহারের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। অতিথিকে সুন্দর প্লেটে আপ্যায়ন করার মাধ্যমে পরিবারের পক্ষ থেকে সম্মান ও গুরুত্ব প্রকাশ পায়। ‘ইউনিফর্মধারীদের ধাওয়ায় তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন’—দীপের বক্তব্যে ‘আশ্বস্ত’ হতে পারছে না পিবিআই। নরওয়েজীয়-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ ও সমাজতাত্ত্বিক থর্স্টেইন ভেবলেন ১৮৯৯ সালে তার প্রকাশিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য থিওরি অব দ্য লেজার ক্লাস’-এ এই ধারণাটি সামনে আনেন।

তবে এই অভ্যাসের একটি অন্ধকার দিকও আছে। যে মা অতিথির জন্য সুন্দর প্লেটটি বের করেন, তিনি হয়তো নিজে কখনো সেই পাত্রে খাবার খাওয়ার সুযোগ পাননি। অনেক সময় দেখা যায়, সুন্দর সেই বাসনগুলো ব্যবহার ছাড়াই আলমারিতে থেকে পুরোনো হয়ে যায়, ভেঙে যায় বা পাড় উঠে যায়। দীর্ঘদিনের অভ্যাস আর আত্মত্যাগের মানসিকতা মিলে অনেক সময় বর্তমানের আনন্দকে ভবিষ্যতের জন্য বিসর্জন দিতে হয়। মুন্নির এই অভ্যাস হয়তো বদলে যাওয়া সময়ের একটা ছবি।