প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের পাঁচটি প্রধান অগ্রাধিকারমূলক খাতে বিনিয়োগ করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। টোকিওতে স্থানীয় সময় বিকেলে জেট্রো হলে আয়োজিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে তিনি এ আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, পারস্পরিক সুবিধা ও স্বার্থের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দু’দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আমি আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা নিয়ে কথা বলতে চাই। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে, ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাবে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ভোক্তা অর্থনীতির একটি হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে টয়োটাকে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এতে জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকেন্দ্রিক একটি উদ্ভাবনমুখী তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরেকটি অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের প্রধান শহরগুলোকে সংযুক্ত করে দেশব্যাপী উড়ালপথে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। এ উদ্যোগের জন্য জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণ, রুটের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি ও বিনিয়োগ সহায়তাকে স্বাগত জানান তিনি। এ ছাড়া, আড়াইহাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। সুমিতোমো করপোরেশন জাপানি মানদণ্ড অনুসরণ করে এ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে তুলছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের উদ্বেগের কথা শুনেছি। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি পুরোপুরি বুঝতে পারি, ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিশ্চয়তা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আসুন, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপান্তর করি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানি ভাষায় দক্ষ বাংলাদেশি পেশাজীবীরা বাংলাদেশ ও জাপান—উভয় দেশের কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

বিনিয়োগের অগ্রাধিকার খাতগুলো হলো মোটরযান উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা, আধুনিক রেলপথ ও সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। জাপানি কোম্পানিগুলো দেশে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান করতে পারে। এসব সমস্যার সমাধান এবং আরও ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে কাজ করছি।’। এই দুটো নিশ্চিত করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের দায়িত্ব।’।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে যে ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান, তাকে আরও উচ্চতর অর্থনৈতিক সহযোগিতায় রূপান্তরিত করার এখনই সুযোগ।

১৯৭২ সালে জাপান যে প্রথম দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তা তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।

এছাড়া নিজের বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানও তিনি তুলে ধরেন, যারা দুই দেশের সম্পর্ক দৃঢ় করতে ভূমিকা রেখেছিলেন।

ফোরামে অংশগ্রহণ ও আলোচনা

  • বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতার রূপরেখা নিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
  • জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকা অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন।
  • জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী শিনজি ওয়াকায়ামা অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন।
  • অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক বিনিময় এবং বিনিয়োগ ও সহযোগিতামূলক নতুন প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
  • বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
  • অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি কাজ করছে, তবে সেখানে জাপানের সরাসরি বিনিয়োগ এখনো ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের নিচে।

গত অর্থবছরে জাপান থেকে বাংলাদেশে ২১৬ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে এবং একই সময়ে জাপানে রপ্তানি হয়েছে ১৩৬ কোটি ডলারের পণ্য।

প্রধানমন্ত্রী এই বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর জোর দেন।

চলতি বছর স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ-কে তিনি এক মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন, যা বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্যের জন্য জাপানি বাজারে শুল্কমুক্ত সুযোগ নিশ্চিত করবে।

মোটরযান খাতের বিষয়ে তিনি জানান, চলতি মাসেই টয়োটা বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যা ২০২৯ সাল নাগাদ পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাবে। ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জ্বালানি খাতে জেরা (JERA)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি এলএনজি অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে জাপানিদের আগ্রহের প্রত্যাশা করেন। প্রযুক্তি ও মহাকাশ সক্ষমতা বাড়াতে একটি প্রযুক্তি পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান। এছাড়া রেলপথ সংযোগ ও উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জাপানি অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশ কাজে লাগাতে চায়। তিনি বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সামগ্রিক জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মহাকাশবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ আগ্রহী। পরে দেশে ফিরে তাঁরা অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগান।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়িক জটিলতা নিরসনে তারা নিয়মিত কাজ করছেন। এছাড়া মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, জাপানে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর লক্ষ্যে তরুণদের ভাষা শিক্ষায় সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশের বিশাল তরুণ শ্রমশক্তি ও ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত বাজারের সুবিধা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য তিনি জাপানি কোম্পানিগুলোকে আশ্বস্ত করেন। বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের বাজার, ২৭ বছরের মধ্যম বয়সের উদ্যমী তরুণ শ্রমশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাংলাদেশের বড় সম্পদ।