প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করার বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে সরকার চরম অস্বস্তিতে পড়েছে। সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন বক্তব্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর শেষ করে দেশে ফিরলে এ ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরপর নির্বাচনের মধ্যদিয়ে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলেন। কিন্তু এটা তো সরকারকে বিব্রত করার মতো অবস্থা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিষয়টিকে ‘অসতর্কতাবশত মন্তব্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অবস্থান জিরো টলারেন্স এবং এটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইজিপি একজন সহজ-সরল মানুষ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা বলতে গিয়ে তিনি সম্ভবত ভুলবশত এমনটি বলে ফেলেছেন। তার এই বক্তব্য সমর্থনযোগ্য নয় এবং এটি সরকারের ভাবমূর্তির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে সরকার নিরলস কাজ করছে এবং বর্তমান প্রশাসন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিপক্ষে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশে কোনো ক্রসফায়ার বা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। যদি স্লিপ অব টাং করে বলেন তাহলে ভিন্ন কথা।
এদিকে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে পুলিশের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন পুলিশপ্রধান হিসেবে তিনি কীভাবে ক্রসফায়ারের কথা বলতে পারেন। রিজভী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের অমানবিক দুঃশাসন ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পর মানুষ একটি মানবিক বাংলাদেশ প্রত্যাশা করছে। এমন পরিস্থিতিতে বাহিনীর প্রধানের মুখ থেকে এ ধরনের বক্তব্য জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তিনি আরও বলেন, সস্তা জনপ্রিয়তা বা ক্রেডিট পাওয়ার উদ্দেশ্যে দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এমন মন্তব্য করলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। যথাযথভাবে পুলিশ বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দিলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। যে ১৭ বছর আমরা এই ক্রসফায়ার, গুম, গুপ্তহত্যা, রক্তঝরানো অমানবিক দুঃশাসন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পরিণতিতে ৫ই আগস্ট পেলাম। সবার প্রত্যাশা একটি মানবিক বাংলাদেশ- সেখানে একটি বাহিনীর প্রধান হয়ে আপনার মুখ দিয়ে এ ধরনের কথা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। তিনি বলেন, এই আইন দিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব। ‘পুলিশ বাহিনীতে অনেক সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন, তাদের নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দিলে সমাজ থেকে অপরাধ দূর করা সম্ভব।
সচিবালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ক্রসফায়ার সংক্রান্ত বিতর্কিত বক্তব্য এবং সাংবাদিকদের প্রতি অশোভন মন্তব্যের বিষয়গুলো সরকারের উচ্চপর্যায়ে গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, পুলিশ সদর দপ্তর পরবর্তী সময়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে, যেখানে আইজিপি তার মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পুলিশপ্রধান তার বক্তব্য থেকে সরে এসেছেন এবং বিতর্কিত সেই অবস্থান পরিত্যাগ করেছেন। তাই এই বিভ্রান্তি নিরসন হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তথ্য উপদেষ্টা। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে সরকার। কারণ, আইজিপি এসব বক্তব্যের কোনোটিই নিজের অবস্থান হিসেবে ধরে রাখেননি, বরং সেখান থেকে সরে এসেছেন।