স্মার্টফোনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্যক্তিগত কৌতূহল কিংবা বিভিন্ন কাজের প্রয়োজনে আমরা নিয়মিত এআইয়ের সঙ্গে চ্যাট করি এবং কাজ শেষে তা ডিলিট বা মুছে ফেলি। সাধারণ ধারণা হলো, ডিলিট করার অর্থ হলো সেই তথ্য চিরতরে মুছে যাওয়া। তবে জর্জিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নতুন একটি গবেষণা এই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে। তাঁদের দাবি, ফোন থেকে এআই চ্যাট মুছে ফেললেও তার সব চিহ্ন মুছে যায় না। কখনো কাজের প্রয়োজনে, কখনো নিছক কৌতূহল মেটাতে আমরা এআইয়ের সঙ্গে নানা কথা বলি। আমরা ভাবি, ডিলিট করেছি মানে সবকিছু চিরতরে মুছে গেল।

গবেষকেরা ‘ওরিজা’ (ORISA) নামে একটি নতুন টুল তৈরি করেছেন, যা অ্যান্ড্রয়েড ফোন থেকে মুছে ফেলা কথোপকথন ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। এই টুল শুধু হারানো তথ্য উদ্ধারই করে না, বরং সেই তথ্যের টুকরোগুলোকে নিখুঁতভাবে জোড়া লাগিয়ে আগের এআই সেশনটিকে পুনরায় সচল করে দিতে পারে। এই গবেষণাপত্রটি ২০২৬ সালের ‘আইইইই সিম্পোজিয়াম অন সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রাইভেসি’ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়েছে। টুলটির নাম দেওয়া হয়েছে ওরিজা (ORISA)।

গবেষণার মূল বিষয়টি বুঝতে হলে লোকাল এআই এবং ক্লাউড এআইয়ের পার্থক্য বোঝা জরুরি।

চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো এআইগুলো মূলত ইন্টারনেটের মাধ্যমে বড় সার্ভারে যুক্ত থাকে, যা ক্লাউড এআই। অন্যদিকে, কিছু এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট সরাসরি ফোনের প্রসেসরে চলে, যেগুলোকে লোকাল এআই বলা হয়। অনেক ব্যবহারকারী লোকাল এআই ব্যবহার করাকে অধিক নিরাপদ মনে করেন, কারণ এতে ব্যক্তিগত তথ্য অন্য কোনো সার্ভারে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। কিন্তু গবেষকদের মতে, লোকাল এআই ব্যবহারের সময় তথ্যগুলো ফোনের র‍্যামে জমা হতে থাকে এবং ডিলিট করার পরও র‍্যামের কোনো এক অংশে সেই তথ্যের অবশিষ্টাংশ থেকে যায়। ওরিজা টুলটি সেই র‍্যাম থেকেই মুছে ফেলা তথ্য খুঁজে বের করে।

গবেষকেরা তাদের পরীক্ষাটি চালানোর জন্য ‘চ্যাটারইউআই’ নামে একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ এবং ‘প্রজেক্ট নোট কিপার’ নামে একটি কাল্পনিক এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট তৈরি করেন। এরপর সেই এআইকে একটি কাল্পনিক প্রজেক্টের ১০০টি তথ্য সরবরাহ করা হয়। পরীক্ষা শেষে গবেষকেরা পুরো চ্যাট হিস্ট্রি ডিলিট করে দেন। ওরিজা ব্যবহার করে যখন পুনরায় সেশনটি চালু করা হয় এবং আগের প্রজেক্টের তথ্য জানতে চাওয়া হয়, তখন এআইটি ২৬টি তথ্য নিখুঁতভাবে ফেরত দেয়।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, চ্যাট ডিলিট করার আগে মূল এআই সেশনটি একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১৪টি তথ্য মনে রাখতে পারতো। কিন্তু ওরিজার মাধ্যমে উদ্ধার করা এআই ২৬টি তথ্য বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ, চ্যাট চলাকালীন এআই নিজে যে তথ্যগুলো তার সক্রিয় মেমোরি থেকে মুছে ফেলেছিল, ওরিজা টুলটি র‍্যাম ঘেঁটে সেগুলোও সফলভাবে উদ্ধার করেছে। গবেষকেরা মোট ১০টি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ এবং ৩টি ভিন্ন এআই মডেলের ওপর ৬০টি আলাদা পরিস্থিতিতে পরীক্ষা চালিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফল হয়েছেন।

এই প্রযুক্তি ডিজিটাল অপরাধ তদন্তকারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও সাধারণ ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। অপরাধীরা কোনো পরিকল্পনার চ্যাট ডিলিট করে দিলেও তদন্তকারীরা এখন তা উদ্ধার করতে পারবেন। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, ডিলিট করা তথ্য চিরকাল র‍্যামে সংরক্ষিত থাকে না। ফোন ব্যবহার করার সময় নতুন নতুন অ্যাপ চালানো বা গেম খেলার কারণে মেমোরির ওই অংশগুলোতে নতুন তথ্য জমা হয়, যাকে বলা হয় ওভাররাইট। ফলে ডিলিট করার পর যত বেশি সময় অতিবাহিত হবে এবং ফোনে যত বেশি কাজ করা হবে, হারানো এআই চ্যাট উদ্ধার করা তত বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। এর মাধ্যমেই ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিতর্কে যুক্ত হলো এক নতুন মাত্রা।

এর আগে এআই সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৫০ বছরের পুরনো একটি গাণিতিক ধাঁধা মাত্র ১১ দিনে সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এছাড়া ১২০০ এআই এজেন্ট নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে সিকিউরিটি সিস্টেম হ্যাক করার চেষ্টায় লিপ্ত হওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্যও সামনে এসেছে। এমনকি এআই এখন গণিত অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন সমাধান করতেও সক্ষম, যা প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিরই প্রমাণ দেয়।