বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা মানেই এক তীব্র প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, আর এতে প্রথম হওয়া একজন শিক্ষার্থীর জন্য রীতিমতো বড় এক মাইলফলক। তবে পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক বছর পর সেই মেধাবীরা এখন কোথায় এবং কী করছেন, সেই খবর অনেকেরই অজানা। ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী অনিক বিশ্বাসের বর্তমান জীবন ও সংগ্রামের গল্পটি তেমনই এক অনুপ্রেরণার উৎস।
ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলের দিনটি অনিকের কাছে আজও বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি জানান, সেই দিনটি ছিল অমানবিক পরিশ্রমের এক স্বস্তির পরিণতি। দুপুরবেলা বাবার সঙ্গে গ্রিন রোডের সাধারণ এক দোকানে নাশতা খাওয়ার পর সন্ধ্যার দৃশ্যটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন; প্রচুর মানুষের ভিড় আর অভিনন্দন বার্তা তাকে এক অনন্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছিল। প্রথম হওয়ার পর পরিচিতি দ্রুত বাড়লেও, ফার্মগেটের ঢাকঢোল বাজানোর মতো অদ্ভুত অভিজ্ঞতায় তিনি কিছুটা অস্বস্তিতেই পড়েছিলেন। অনিক জানান, তার সাফল্যের খবরে মায়ের আনন্দিত হওয়ার মুহূর্তটি ছিল ওই সময়ের সবচেয়ে দামী প্রাপ্তি।
পড়াশোনার বিষয়ে অনিক জানান, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনে সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজিতে পিএইচডি করছেন। গবেষক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি এর আগে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতাও করেছেন।
ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার অর্জনকে জীবনের একটি ধাপ হিসেবেই দেখেন অনিক। তার মতে, এই সাফল্য উচ্চশিক্ষা বা চাকরিজীবনে সরাসরি প্রভাব না ফেললেও, এটি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। তবে পিএইচডি শুরুর পথে তাকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যা শিখেছি, তা হলো, যেকোনো মানুষের কাছেই পৃথিবীর সিস্টেমগুলোর বেশির ভাগই অজানা। নতুন কোনো জায়গায় খাপ খাওয়াতে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়, এটা মেনে নিয়েই এগোতে হয়। আর অবশ্যই ভাগ্যের সাহায্য লাগে।’
ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অনিক পরামর্শ দেন, শুধুমাত্র প্রথম হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোলে প্রত্যাশার চাপে হতাশা তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই যথাসাধ্য প্রস্তুতি নেবেন। তবে প্রথম হওয়ার টার্গেট রাখা ঠিক নয়। সে ক্ষেত্রে প্রত্যাশাই হতাশার মূল হয়ে যেতে পারে। এর চেয়ে বরং ভর্তি পরীক্ষাকে জীবনের একটা স্টেপ হিসেবে দেখুন, স্বাস্থ্য ঠিক রেখে যাকে সদর্পে পার করতে হবে।’ পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকা ও নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে অনিক জানান, তিনি বায়োমেডিক্যাল গবেষণায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। বিশেষ করে জটিল রোগের কারণ উদ্ঘাটন এবং কার্যকর প্রতিকার নির্ণয়ে কাজ করাই তার মূল লক্ষ্য। তার এই পথচলা প্রমাণ করে যে, ভর্তি পরীক্ষার সাফল্যের চেয়েও ক্যারিয়ারের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জনে নিরলস পরিশ্রম ও মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতাই বেশি জরুরি।