রাজধানীর হাজারীবাগে অবস্থিত এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয় ও গুদামে একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার রাতে প্রতিষ্ঠানটির মামলার বাদীকে মুঠোফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। হুমকিদাতার ভাষ্য অনুযায়ী, আজ শনিবারের মধ্যে সমঝোতা না করলে তাকে জীবন দিতে হবে। এই হুমকির কয়েক ঘণ্টা পর আজ ভোরে দুর্বৃত্তরা কুরিয়ার সার্ভিসটির কার্যালয়ের সামনে রাখা দুটি কাভার্ড ভ্যানের সামনের কাঁচ ভাঙচুর করে। গত চার দিনের ব্যবধানে এটি দ্বিতীয় হামলার ঘটনা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, শনিবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে পাঁচটি মোটরসাইকেলে করে ১০ থেকে ১৫ জন ব্যক্তি কুরিয়ার সার্ভিসের সামনে আসেন। এরপর হুমকি দেওয়া ব্যক্তি ফোন কেটে দেন।
তারা অতর্কিতে কাভার্ড ভ্যানের কাঁচ ভেঙে দ্রুত সটকে পড়েন।
এর আগে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে শিকদার মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন এই কার্যালয়ে মুখোশধারী ও হেলমেট পরিহিত একটি দল দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো করে গুদামে থাকা ডিভিআর ডিভাইসটি নিয়ে যায় এবং আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, ওই ঘটনায় ৩১ লাখ টাকার পণ্য লুট হয়েছে। প্রথমে তারা কার্যালয়ের আশপাশের বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে দেয়। সন্ত্রাসীরা মুখোশ ও হেলমেট পরা ছিল। পরে গুদামে ঢুকে ক্যামেরা ও ডিভিআর (ফুটেজ সংরক্ষণের যন্ত্র) খুলে নেয়। যাওয়ার আগে কার্যালয়ের আসবাব ভাঙচুর ও বেশ কয়েকটি ল্যাপটপ লুট করা হয়।
এ ঘটনায় এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিন বাদী হয়ে হাজারীবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে মামলার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন। কর্মকর্তারা জানান, হামলাকারীরা নিজেদের শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। মূলত শিকদার গ্রুপের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া এই জমির ভাড়া এখন থেকে ইমনের কাছে দেওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে তারা জানিয়েছেন। এতে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। প্রতিষ্ঠানটি দুই বছর আগে শিকদার গ্রুপের কাছ থেকে চুক্তির মাধ্যমে জমিটি ভাড়া নেয়।
ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিনের সঙ্গে হুমকিদাতার ফোনালাপের একটি অডিও রেকর্ড পাওয়া গেছে। অডিওটিতে দেখা যায়, ওই ব্যক্তি অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করছেন এবং মামলা করার বিষয়ে ক্ষোভ ঝাড়ছেন। হুমকিদাতা বলেন, আজ শনিবারের মধ্যে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা না করলে বাদীর পরিণতি ভয়াবহ হবে। পরিচয় জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি নিজেকে ‘তোর বাপ’ হিসেবে দাবি করেন এবং প্রতিষ্ঠানের মালিক কে সেই বিষয়ে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেন। এমনকি প্রতিষ্ঠানের মালিক না হয়েও তিনি কেন মামলার বাদী হয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। হুমকিতে বলা হয়, ‘সবার আগে তোর লাশ পড়ে থাকবে। এতে শোনা যায়, হুমকিদাতা সালাম দিয়ে আফসারকে বলছেন, ‘ভাই, মামলার বাদী যে হলেন আপনার নিজের মামলার বাদী কে হবেন?’। জবাবে হুমকিদাতা বলেন, ‘কোনটা আপনি বোঝেন না?’। তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘কালকের দিন সময় দিলাম, তোর বাপের সাথে কথা বলে ঝামেলা শেষ করতে বল। তখন মুঠোফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘মালিক না তো বাদী হইছোস কেমনে।
এ বিষয়ে হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, বাদীর কাছ থেকে পাওয়া অডিও ক্লিপটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং একে মামলার তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে ভোরবেলার ভাঙচুরের বিষয়টিও তারা অবগত রয়েছেন। আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত আছে। ভুক্তভোগী ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিন জানান, তিনি ও তার সহকর্মীরা এখন রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তার আবেদন জানাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ব্যক্তিদের নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি চলমান থাকলেও হাজারীবাগের মতো বাণিজ্যিক এলাকায় এ ধরনের হামলা ও হুমকির ঘটনায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। চাঁদাবাজিতে সক্রিয় ১৪৮ অস্ত্রধারী, ঢাকায় কোথায় বেশি সক্রিয়।